২০ জুলাইয়ের ডেডলাইন পেরিয়ে আরও ২১ দিন, এসএসসির ফল প্রকাশে কেন এত বিলম্ব?
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রথমে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে প্রকাশের কথা জানানো হয়েছিল। পরে সেই সময়সূচি পরিবর্তন করে ২৮ জুলাইয়ের পর যে কোনো দিন ফল প্রকাশের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সময়সীমাও রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১০ আগস্ট ফল প্রকাশ করা হবে। বারবার ফল প্রকাশের তারিখ পরিবর্তনের কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা, গুঞ্জন ও জল্পনা-কল্পনা ছড়িয়ে পড়েছে।
বিগত কয়েক বছরের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ, ২০২৪ সালে গড় পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ, ২০২৪ সালে পাশের হার ছিল ৮৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ধারণা করা হচ্ছে এবার ফলাফল বিগত সময়ের চেয়ে খারাপ হতে পারে।
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ২০ জুলাইয়ের মধ্যে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের কথা জানিয়েছিলেন। ১১ জুলাই ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানও ওই সময়ের মধ্যেই ফল প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে বলে জানন। তবে ১৮ জুলাই আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ড জানায়, নির্ধারিত সময়ে ফল প্রকাশ সম্ভব হচ্ছে না এবং তখনও চূড়ান্ত ফল প্রস্তুত হয়নি।
পরবর্তীতে ২৮ জুলাইয়ের পর যে কোনো সময় ফল প্রকাশের পরিকল্পনার কথা বলা হলেও সেটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—প্রাথমিকভাবে প্রস্তুত থাকা ফল প্রকাশে কেন আরও প্রায় এক মাস সময় লাগছে?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল আগের বছরের তুলনায় খারাপ হতে পারে। সেজন্য ফল প্রকাশে বিলম্ব হতে পারে। তাদের ভাষ্য, সরকারের প্রথম বড় পাবলিক পরীক্ষায় ফল আশানুরূপ না হওয়ায় ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই চলছে। তবে এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। যদিও আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ড এ ধরনের অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে। তাদের দাবি, টানা বৃষ্টি ও বন্যা পরিস্থিতির কারণে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে চাপ তৈরি হয়েছিল। এর প্রভাব এসএসসির ফল প্রকাশের কাজেও পড়েছে।
‘ফলাফল টেম্পারিং বা ঘষামাজার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের খবর সম্পূর্ণ বানোয়াট।’—প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান, চেয়ারম্যান, ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড
এ বিষয়ে আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ডের সাব-কমিটির সভাপতি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘ফলাফল টেম্পারিং বা ঘষামাজার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের খবর সম্পূর্ণ বানোয়াট।’
পরীক্ষকদের অভিজ্ঞতায় ফেলের হার বেশি
ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়া, ঝিনাইদহ, বরিশাল, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ২০ জন পরীক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার সামগ্রিক ফলাফল খারাপ হতে পারে। বিশেষ করে গণিত, ইংরেজি, পদার্থ এবং রসায়নের ফলাফল খারাপ হতে পারে। শুধু এই বিষয়গুলোই নয়; ইসলাম শিক্ষা, জীব বিজ্ঞানসহ তুলনামূলক সহজ হিসেবে পরিচিত বিষয়গুলোতেও ফেল করেছেন পরীক্ষার্থীরা। যা সামগ্রিক ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মত পরীক্ষকদের।
এই ২০ শিক্ষকের খাতা মূল্যায়নের অভিজ্ঞতা থেকে জানা গেছে, তাদের কাছে আসা খাতাগুলোর মধ্যে পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে। খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংহতি বা বাড়িয়ে নম্বর দেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীরা যে নম্বর প্রাপ্য সেটিই দিয়েছেন তারা।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ঝিনাইদহের এক শিক্ষক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এসএসসির গণিতের ২২৫ টি খাতা পেয়েছিলাম। এর মধ্যে ফেল ছিল ৪৩ জন। জিপিএ-৫ পাবে এমন খাতা ছিল ৪০টি। কারিগরির গণিত খাতা পেয়েছিলাম ৩৫০টি। এর মধ্যে ফেলই ছিল ২৯০ জন।
রসায়নের খাতা মূল্যায়ন করা আরেক পরীক্ষক জানান, ‘তিনি ৩০০টি খাতা পেয়েছিলেন। এর মধ্যে ৪৫ জন ফেল করেছেন। জিপিএ-৫ পাবে এমন খাতা ৮০টি।’ ইসলাম শিক্ষার খাতা মূল্যায়ন করা এক শিক্ষক জানান, ‘৩০০ খাতায় ৩৫ ফেল। ইসলাম শিক্ষায় এই অবস্থা হলে অন্য বিষয়গুলোর অবস্থা কেমন হতে পারে সেটি খুব সহজেই অনুমেয়।’
গাজীপুরের একজন প্রধান পরীক্ষক বলছিলেন, ‘আমি ৬ হাজার খাতা দেখেছি। এর মধ্যে অর্ধেকই ফেল। ফেলের ক্ষেত্রে বিগত ১০ বছরের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে।’ তবে মন্তব্য করার পর নিজের নাম-পরিচয় উল্লেখ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
‘কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেশি ফেল হবে, আবার কোনোটিতে বেশি পাস হবে। আপনি (প্রতিবেদক) যাদের সাথে কথা বলেছেন, তাদের ক্ষেত্রে এমনটি হতে পারে। আবার অন্যদের ক্ষেত্রে পাসের হার আরও বেশি হতে পারে। ফলে ২০ জন শিক্ষকের অভিজ্ঞতাকে সামগ্রিক ফলাফল হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না।’—সভাপতি, আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ড
খাতা মূল্যায়নের সাথে যুক্ত পরীক্ষক এবং প্রধান পরীক্ষকের এমন অভিজ্ঞতার বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ড সভাপতি প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেশি ফেল হবে, আবার কোনোটিতে বেশি পাস হবে। আপনি (প্রতিবেদক) যাদের সাথে কথা বলেছেন, তাদের ক্ষেত্রে এমনটি হতে পারে। আবার অন্যদের ক্ষেত্রে পাসের হার আরও বেশি হতে পারে। ফলে ২০ জন শিক্ষকের অভিজ্ঞতাকে সামগ্রিক ফলাফল হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না।’
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে দেখা যায়, এবার এসএসসির ফল খুব খারাপ হয়েছে, সেজন্য প্রকাশ করতে সময় নিচ্ছে বোর্ড। কোথাও কোথাও লেখা হয়, পাসের হার বাড়াতে সময় নিচ্ছে শিক্ষা বোর্ড। আবার শিক্ষা বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তাও এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন।
যদিও এ ধরনের খবরকেও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ড সভাপতি প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান। তিনি জানান, ‘ফেসবুকে ছড়ানো খবরের সত্যতা নেই।’