এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের চিন্তা ছিল আন্তঃশিক্ষা বোর্ডেরও, কিন্তু...
ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রাম বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। টানা বৃষ্টি ও বন্যার পূর্বাভাস দিয়ে রেখেছে আবহাওয়া অধিদপ্তরও। এরপরও এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অব্যাহত থাকায় এবং সারা দেশে শিক্ষার্থীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হওয়ায় তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে। যদিও বোর্ডগুলো বলছে, পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা পরীক্ষা স্থগিত রাখার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে। তবে স্থানীয় প্রশাসন পরীক্ষা চালিয়ে নেওয়ার পক্ষে মত দেওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত স্থানীয় স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নেওয়া হলেও বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন বা সুপারিশ পাঠানো হয়নি। ফলে সেসব এলাকাতেও নির্ধারিত সময়েই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈরি আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে এমন লেজেগোবরে অবস্থার জন্য একে অন্যকে দায়ী করে বক্তব্য দিচ্ছেন শিক্ষা বোর্ডের হর্তাকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আন্তঃশিক্ষা শিক্ষাবোর্ড সমন্বয় কমিটির শীর্ষ এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আমরা রাত পর্যন্ত চিন্তাভাবনা করেছি পরীক্ষা স্থগিত করার। কিন্তু জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের থেকে আমরা সাড়া পাইনি, তারা পরীক্ষা নিতে পারবে বলে রীতিমতো চাপ দিয়েছে। তাদের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই আমাদের সিদ্ধান্ত দিতে হয়। শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা নেওয়ায় এখন সমালোচনা হচ্ছে।’
এরইমধ্যে আজ সোমবার (১৩ জুলাই) দেশের বিভিন্ন স্থানে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের তীব্র ভোগান্তির শিকার হওয়ার তথ্য এসেছে। তাদেরকে হাঁটু সমান পানি মাড়িয়ে কিংবা নৌকায় কেন্দ্রে যেতে দেখা গেছে। দেশের অধিকাংশ স্থানে বৃষ্টিতে ভিজে কেন্দ্রে যেতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। এ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা স্থগিতের দাবি তুলেছেন শিক্ষাবিদসহ অনেক অভিভাবক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ।
এ বিষয়ে জানতে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রোজী আকতার, নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম এবং হাতিয়া থানার ইউএনওকে মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল দেওয়া হলেও তারা রিসিভ করেননি। আর ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর পরীক্ষা স্থগিতের বিষয়ে শিক্ষাবোর্ডকে কোন প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন কুমিল্লা সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা তুজ জোহরা।
তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, পরীক্ষা স্থগিত বা কেন্দ্র পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত শিক্ষা বোর্ডের। এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। সদর উপজেলার সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রটি সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতার মধ্যে পড়েছে। তবে সেটি অন্যত্র সরানো হবে কি না, সে বিষয়ে বোর্ড থেকে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
শিক্ষাবোর্ড স্থানীয় প্রশাসনের রিপোর্টের আলোকে পরীক্ষা স্থগিত করে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের করা হয়নি। তবে আজ জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিষয়টি বোর্ডকে জানানো হবে।’
ইউএনও আরও বলেন, গতকাল পর্যন্ত কেন্দ্রগুলো ঝুঁকিপূর্ণ এমন কোনো লিখিত প্রতিবেদন ছিল না। ভোর ৪টার পর থেকে বৃষ্টির কারণে আজ জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি বুঝেই প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এখন বোর্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে প্রশাসন।
এ বিষয়ে আন্তঃশিক্ষা শিক্ষাবোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘কয়েকটি জেলার পরীক্ষাকেন্দ্রে জলাবদ্ধতার তথ্য আমরা পেয়েছি। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। কোথায় কী পরিস্থিতি রয়েছে, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘গতকাল পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছিল। তবে রাতের বৃষ্টিতে কয়েকটি এলাকায় নতুন করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগের বিষয়টি শিক্ষা বোর্ডের নজরে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। প্রয়োজন হলে বৃহত্তর পরিসরে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান বলেন, ‘পরীক্ষা হবে কি না, সেটি আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে বসে সিদ্ধান্ত দিই না। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসন কেন্দ্র ও আশপাশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আমাদের কাছে প্রতিবেদন পাঠায়। তারা যদি জানান যে পরীক্ষা নেওয়ার মতো পরিবেশ নেই, তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’
তিনি বলেন, ‘শুধু পরীক্ষাকেন্দ্র নয়, শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারবে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়। কোথাও রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেলে বা স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত হলে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়। তবে স্থানীয় প্রশাসন থেকে এ ধরনের সুপারিশ না আসা পর্যন্ত পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরীক্ষা পেছালে শিক্ষার্থীদের ওপর বড় ধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয়। তারা দীর্ঘদিন প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় বসে। তাই স্বাভাবিক পরিস্থিতি থাকলে পরীক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পরিস্থিতি একেবারে অস্বাভাবিক হলে অবশ্যই পরীক্ষা স্থগিত করা হবে।’
কুমিল্লার কয়েকটি কেন্দ্রের পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে চেয়ারম্যান বলেন, ‘আজ কয়েকটি কেন্দ্রে হাঁটু সমান পানি ছিল। জেলা প্রশাসন সেখানে নৌকা ও অন্যান্য ব্যবস্থা করে শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে। হঠাৎ কোনো কেন্দ্রের ভেতরে পানি ঢুকে গেলে সেটি তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি। তবে আগামী পরীক্ষার আগে কোথাও এমন পরিস্থিতি থাকলে স্থানীয় প্রশাসন আমাদের জানাবে। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
আরও পড়ুন: বৃষ্টিতে ভিজে পানি মাড়িয়ে কেন্দ্রে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা, অসন্তোষ শিক্ষাবিদ-অভিভাবকদের
আগামী বছর থেকে পরীক্ষার সূচি এগিয়ে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরীক্ষার সময়সূচি বর্ষাকাল এড়িয়ে আনার চেষ্টা করছে। মন্ত্রী আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, ২০২৭ সাল থেকে এসএসসি জানুয়ারিতে এবং এইচএসসি জুনে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। জুনে পরীক্ষা হলে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে। ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে পরীক্ষা আরও এগিয়ে আনারও পরিকল্পনা রয়েছে।’
রবিবার এক অনুষ্ঠানে আবহাওয়া পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘আমরা গভীর পর্যবেক্ষণে আছি। চেষ্টা করব কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায়। ঢাকাতেও ভারী বৃষ্টি বর্ষণ হয়েছে।’ আবহাওয়া দেখে এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত সতর্কবার্তায় শনিবার দুপুর ১২টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির আভাস দিয়েছে।
একই সাথে আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় হয়েছিল ১৭৫ মিলিমিটার, যা চলতি মৌসুমে রাজধানীতে এক দিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। একই সময়ে চট্টগ্রামে ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ ড. মো. বজলুর রশিদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সোমবারও ঢাকায় বৃষ্টি থাকবে। তবে মঙ্গলবার থেকে ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টির প্রবণতা কমে আসতে পারে। তবে মোটামুটি এ সপ্তাহ দেশের কিছু অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।