০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৬:১৯

শিক্ষাক্ষেত্রে ভৌগোলিক বৈষম্য দূর করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে: ইউজিসি সদস্য ড. মামুন

রাবিপ্রবিতে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড মামুন  © সংগৃহীত

সরকারের নির্বাচনী ইস্তেহার বাস্তবায়নে দেশের উচ্চশিক্ষায় বিদ্যমান ভৌগোলিক বৈষম্য দূর করে সব অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন।

বুধবার (৪ নভেম্বর) রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবিপ্রবি) ‘Academia-Industry Collaboration for Innovation, Emerging Technologies and Academic Excellence’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার গুণগত মান ও গবেষণার সুযোগ সমানভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে যেন শিক্ষা, গবেষণা কিংবা প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে পিছিয়ে না থাকে সেজন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে I এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর  উপরও তিনি গুরুত্ব  আরোপ করেন I তিনি বলেন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ শিক্ষক ও গবেষকদের সঙ্গে নতুন এবং আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সংযোগ তৈরি করতে হবে।

ড. মামুন বলেন, দেশের সব অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়কে সমানভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। অতীতে ফ্যাসিস্ট সরকার বিভিন্ন অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলেও সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ, আধুনিক অবকাঠামো, গবেষণার সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করেনি, ফলে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের  নির্দেশনা অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষায় বিদ্যমান এসব বৈষম্য দূর করে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। 

তিনি আরও বলেন, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া উচ্চশিক্ষার গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়। বর্তমানে জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এ বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, রাজধানী ও বড় শহরকেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষার সুযোগের বাইরে দেশের প্রত্যন্ত ও পার্বত্য অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও সমানভাবে সক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শিক্ষক বিনিময়  ফ্যাকাল্টি এক্সচেঞ্জ, যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ফ্যাকাল্টি এক্সচেঞ্জের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শিক্ষক বিনিময় কার্যক্রম চালু ও সম্প্রসারণ করা গেলে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এর মাধ্যমে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ শিক্ষক অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন। পাশাপাশি যৌথ গবেষণা, সেমিনার, একাডেমিক পরামর্শ এবং শিক্ষার্থীদের জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একাডেমিক বৈষম্য কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। একই সাথে তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য সামার স্কুল প্রোগ্রাম চালু করার পরিকল্পনার কথা জানান। এতে এক  বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারবে। তাদের মধ্যে যোগাযোগ ও  জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরী হবে। 

স্মার্ট ক্যাম্পাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে ইউজিসি সদস্য বলেন, বর্তমান বিশ্বে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্মার্ট ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তুলতে আধুনিক ডিজিটাল অবকাঠামো, উচ্চগতির ইন্টারনেট, স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ, ডিজিটাল লাইব্রেরি, অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা যেকোনো স্থান থেকে মানসম্মত শিক্ষা ও জ্ঞানসম্পদ ব্যবহারের সুযোগ পাবে। বিশেষ করে ভৌগোলিকভাবে দুর্গম অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

পার্বত্য ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি বলেন, এসব অঞ্চলে আগামী দুই বছরের মধ্যে দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও ৫জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা হবে এর ফলে শিক্ষার্থীরা অনলাইন শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক জ্ঞানভান্ডারে প্রবেশের আরও সুযোগ পাবেন। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কোনো শিক্ষার্থী যেন আধুনিক শিক্ষা ও প্রযুক্তির সুযোগ থেকে পিছিয়ে না থাকেন, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য একটি জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা। এ লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (ICT), সাইবার নিরাপত্তা, রোবোটিকস, অটোমেশন এবং ডেটা সায়েন্সের মতো আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশীয় সমস্যার প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান বের করতে হবে।

একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি কোলাবোরেশনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে অধ্যাপক ড. মামুন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান ও গবেষণাকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে উঠলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে। পাশাপাশি যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ইন্টার্নশিপ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং গবেষণা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশের প্রতিটি অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পিতভাবে উচ্চশিক্ষার উন্নয়ন করতে হবে। বিশেষ করে পার্বত্য ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক শিক্ষা অবকাঠামো, গবেষণার সুযোগ, দক্ষ শিক্ষক এবং প্রযুক্তিগত সুবিধা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে দেশের সব অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত উচ্চশিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবাল এবং রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী।

সেমিনারের অংশ হিসেবে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের আয়োজন করা হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষতা উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়ার উপর গুরুত্ব দেয়া হয়।  

সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।