‘জুলাই’ শব্দের উল্লেখ না করেই পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হলো শহীদ আনাসের গল্প
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আলোচিত শহীদ রাজধানীর স্কুল ছাত্র শাহারিয়ার খান আনাস। আসন্ন ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে প্রথমবারের মতো এই শহীদের স্মরণে চতুর্থ শ্রেণির বাংলা বইয়ের ২৪ নম্বর পাঠে ‘শহীদ আনাসের কথা’ নামে একটি পাঠ যুক্ত করা হয়েছে। যদিও এর আগে ২০২৬ সালের অষ্টম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য কণিকা বইটির শেষ প্রচ্ছদে শহীদ আনাসের চিঠিটির ছবি সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রথমবারের মতো পাঠ আকারে পাঠ্যবইয়ে স্থান পেল শহীদ আনাসের স্মৃতিচারণ। তবে গদ্যটির কোথাও তাকে ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি পুরো গল্পে ‘জুলাই আন্দোলন’, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’ বা ‘জুলাই’ শব্দটিরও উল্লেখ নেই।
জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে (জুলাই আন্দোলন) শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে কোটা সংস্কারের দাবিতে চলা আন্দোলনে একের পর এক হত্যার প্রেক্ষাপটে এক সময় তা সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে রূপ নেয়। ওই বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তৎকালীন আওয়ামী সরকারের পতন ঘটে। এই অভ্যুত্থানে নিহতদের ‘জুলাই শহীদ’ এবং আহতদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১৭ জুন ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে। পরবর্তীতে সরকার ৫ আগস্টকে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ নামকরণ করে জাতীয় দিবস ও সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করে। সাধারণ জনতা এই দিনটিকে ‘৩৬ জুলাই’ নামকরণ করে।
শহীদ আনাস ছিলেন বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। ৫ আগস্ট বাবা-মায়ের উদ্দেশ্যে বিদায়ী চিঠি লিখে ফুসে উঠা কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং চানখাঁরপুল এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিলো মাত্র ১৬ বছর ৯ মাস, যা সাধারণ জনতার বিবেকে নাড়া দিয়েছিল।
সরকার পতনের এক দফা দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। এ কর্মসূচিতে সেদিনই আওয়ামী সরকারের পতন ঘটে। সেদিন এ কর্মসূচি সফল করতে রাজপথে নামা ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় হত্যা করা হয়। এই ছয় শহীদের একজন শাহারিয়ার খান আনাস। তখন তার বয়স ছিল ১৬ বছর ৯ মাস। তিনি একজন গেজেটভুক্ত জুলাই শহীদ।
রাজধানীর গেন্ডারিয়ার আদর্শ একাডেমিতে বিজ্ঞান বিভাগে দশম শ্রেণিতে পড়ত আনাস। সে ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছিল। ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে যোগ দিতে সেদিন সকালে কাউকে কিছু না বলে গেন্ডারিয়ার বাসা থেকে বের হয়েছিল আনাস। বের হওয়ার আগে সে একটি চিঠি লিখে রেখে গিয়েছিল। তার মৃত্যুর পর তার লেখা একটি চিঠি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা সবাইকে আবেগাপ্লুত করে।
চলতি বছরের ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শহীদ আনাসের মা সানজিদা খান তার ছেলের লেখা ওই চিঠিটি জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাঠ্যবইয়ে শহীদ আনাসের স্মৃতিচারণে একটি পাঠ যুক্ত করা হচ্ছে বলে আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তিকে আশ্বস্ত করেন। এরপরই মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এনসিটিবি বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করে। সর্বশেষ চতুর্থ শ্রেণির বাংলা বইয়ে স্থান পেল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আলোচিত এই শহীদের স্মৃতিচারণ।
চতুর্থ শ্রেণির আমার বাংলা বইয়ে যুক্ত হওয়া ‘শহীদ আনাসের কথা’ গদ্যটি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো
শহীদ শাহারিয়ার খান আনাস ছিলেন বাংলাদেশের একজন সাহসী কিশোর। তাঁর বয়স ছিল কম, কিন্তু তাঁর চিন্তার জগৎটা ছিল অনেক বড়ো, অনেক সুন্দর। তাঁর হৃদয় জুড়ে ছিল দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা। এটুকু বয়সেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন একটি বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের। তিনি স্বপ্ন দেখতেন এমন একটি বাংলাদেশের, যেখানে কোনো জুলুম ও জবরদস্তি থাকবে না। সেই লালিত স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্যে ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণ-আন্দোলনে যোগ দিতে তিনি রাজপথে নেমে আসেন। ৫ই আগস্ট, ২০২৪ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন শাহারিয়ার খান আনাস। তিনি ছিলেন দশম শ্রেণির ছাত্র। তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ১৬ বছর।
শহীদ আনাসের মায়ের কথায়, তিনি ছিলেন সহজ-সরল। ঢাকার পথ-ঘাটও তেমন চিনতেন না ৷ তাই ২০২৪-এর গণ-আন্দোলনের সময় বাবা-মা তাঁকে চোখে চোখে রাখতেন। কিছুতেই বাইরে যেতে দিতেন না । ৫ই আগস্ট ভোরে বাবা-মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি ঠিকই ঘর থেকে বেরিয়ে যান। তাঁর প্রতিজ্ঞা ছিল, ফ্যাসিবাদের পতন না ঘটিয়ে ঘরে ফিরবেন না। তাই বের হওয়ার সময় ব্যাগে ভরে নেন নিজের কাপড়চোপড় ও প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম।
শহীদ আনাস পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায় অবস্থিত আদর্শ অ্যাকাডেমি গেন্ডারিয়ার দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। তার পিতা সাহরিয়া খান একজন ব্যবসায়ী এবং তার মাতা সানজিদা খান দিপ্তী গৃহিণী ছিলেন। বাবা-মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে আনাস ছিলেন সবার বড়। তার ছোট দুই ভাই পাঁচ বছর বয়সী সাফওয়ান ও দুই বছর বয়সী সুফিয়ান। ঢাকার গেণ্ডারিয়া এলাকার দীননাথ সেন রোডে পরিবারসহ ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি।
আন্দোলনে যাওয়ার আগে আনাস তাঁর মাকে সম্বোধন করে লিখে যান এক মর্মস্পর্শী চিঠি। আনাস শহীদ হওয়ার পর তাঁর সেই চিঠি প্রথমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পরে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর সেটি কোটি হৃদয়ে শোকের ঝড় তোলে । তাঁর আত্মত্যাগের স্পৃহা ও দেশপ্রেম সবাইকে বিস্মিত করে। চিঠিতে তিনি লেখেন –
“মা, আমি মিছিলে যাচ্ছি। আমি নিজেকে আর আটকিয়ে রাখতে পারলাম না। সরি আব্বুজান তোমার কথা অমান্য কোরে বের হোলাম। স্বার্থপরের মতো ঘরে বোসে থাকতে পারলাম না। আমাদের ভাইরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কাফনের কাপড় মাথায় বেধে রাজপথে নেমে সংগ্রাম কোরে যাচ্ছে। অকাতরে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিচ্ছে। একটি প্রতিবন্ধি কিশোর, ৭ বছরের বাচ্চা, ল্যাংরা মানুষ যদি সংগ্রামে নামতে পারে, তাহলে আমি কেন বোসে থাকবো ঘড়ে। একদিন তো মরতে হবেই। তাই মৃত্যুর ভয় কোরে স্বার্থপরের মতো ঘরে বোসে না থেকে সংগ্রামে নেমে গুলি খেয়ে বীরের মতো মৃত্যুও অধিক শ্রেষ্ঠ। যে অন্যের জন্য নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেয় সেই প্রকৃত মানুষ। আমি যদি বেচে না ফিরি তবে কষ্ট না পেয়ে গর্বিত হয়ো। জীবনের প্রতিটি ভুলের জন্য ক্ষমা চাই। —আনাস । ”
(শহীদ আনাসের চিঠির ভাষা ও বানান অবিকল রাখা হয়েছে)
তাঁর চিঠির প্রতিটি শব্দে রয়েছে গভীর দেশপ্রেম ও প্রবল আত্মবিশ্বাস। দেশ ও মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার কোনো তুলনা হয় না। আনাস ছিলেন খুবই শান্ত, ভদ্র এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল ও কর্তব্যপরায়ণ। ফুল, পাখি, গাছপালা ও সবুজ প্রকৃতি ছিল তাঁর খুব প্রিয়। মা-বাবা এবং দুই ছোট ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক। কিন্তু দেশের প্রতি অসীম মমত্ববোধ পরিবারের মায়ার বন্ধনকে ছিন্ন করতে তাঁকে সেদিন উদ্বুদ্ধ করেছিল।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের জেগে ওঠা আনাসকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। বিপ্লবের বাঁধভাঙা আহ্বান তাঁর কিশোরমন অস্বীকার করতে পারেনি। তাঁর মনে ছিল অদ্ভুত এক দৃঢ় সংকল্প। তাঁর মনে প্রবল বিশ্বাস ছিল যে, দেশ ফ্যাসিবাদের কবল থেকে মুক্তি পাবেই। সফল হবে আন্দোলন।
৫ই আগস্ট, ২০২৪ পুলিশ ঢাকার যেসব জায়গায় নির্মম হত্যাকাণ্ড চালায়, তার মধ্যে অন্যতম ছিল পুরান ঢাকার চানখাঁরপুলের নিমতলি। গেণ্ডারিয়া থেকে আন্দোলনকারীদের সাথে অলিগলি ঘুরে এই নিমতলিতে এসেছিলেন শহীদ আনাস। পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণের মুখে অনেক আন্দোলনকারীর সাথে তিনিও আশ্রয় নিয়েছিলেন সংকীর্ণ নবাব কাটার গলিতে। সেই গলিতে পুলিশের সামনে পড়ে যান ভয়ার্ত আনাস। নিষ্পাপ কিশোরের ভয়ার্ত মুখও পুলিশের মনে করুণা জাগায়নি সেদিন। নিকট- -দূরত্ব থেকে গুলি চালিয়ে তাঁকে হত্যা করে পুলিশ। আনাস ছাড়াও সেদিন চানখাঁরপুলে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন শেখ মাহদি হাসান জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক ।
আনাসদের পৈতৃক নিবাস মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরে। কিন্তু তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় । তাঁর পিতার নাম সাহরিয়ার খান পলাশ ও মাতার নাম সানজিদা খান দীপ্তি। সাহরিয়া খান পলাশের তিন পুত্রসন্তানের মধ্যে আনাস ছিলেন সবার বড়ো। তাঁর জন্ম ২০০৭ সালের ১৪ই অক্টোবর । মৃত্যু ৫ই আগস্ট, ২০২৪। শহীদ আনাসকে ঢাকার জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
শহীদ আনাস আদর্শ একাডেমি গেণ্ডারিয়া, ঢাকার ছাত্র ছিলেন। পড়তেন দশম শ্রেণিতে বিজ্ঞান শাখায়। তাঁর স্বপ্ন ছিল বুয়েটে ভর্তি হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। কিন্তু ঘাতকের বুলেট কেড়ে নিয়েছে তাঁর জীবন। জাতির স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিজের স্বপ্নসাধ ও জীবনকে উৎসর্গ করে তিনি হয়ে গেছেন চির অমর । তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই সত্যিকারের মানবতা ৷ মানুষের জীবন ছোটো কিন্তু তার কর্ম ও আদর্শ অনেক বড়ো।
শহীদ আনাস জাতির সাহস ও অনুপ্রেরণার প্রতীকরূপে চিরদিন বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার মধ্য দিয়ে আমরা তাঁর প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে পারি।