পাঁচ দশকে আট নীতি ও কমিশন: অচলাবস্থায় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা
স্বাধীনতার ৫৫ বছর। দীর্ঘ এ সময়ে শিক্ষা নিয়ে কমিশন হয়েছে মোট আটটি। নানা পরিকল্পনার হয়েছে, সুপারিশ এসেছে ডজন ডজন সংস্কার। কিন্তু রাজনৈতিক ও নীতিগত ঐক্যমত্যের ধারাবাহিকতার অভাবে এসবের বড় অংশই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে কাগুজে নীতিমালায়। বছরের পর বছর ধরে চলা কাঠামোগত এই ‘অসুস্থতা’ এখন বাংলাদেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
প্রথম পর্বে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় পাস করাতে শেখায়। কিন্তু চিন্তা করতে শেখায় না। শিক্ষাবিদরা এটিকে বলছেন ‘আইসিইউ সংকট’। তারা এ-ও বলছেন, এই সংকট রাতারাতি তৈরি হয়নি। পাঁচ দশক ধরে গঠিত কমিশন, জমা দেওয়া সুপারিশ এবং পরিত্যক্ত সংস্কারের পুঞ্জীভূত ফলই আজকের অবস্থা।
তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯৭২ সালে কুদরাত-ই-খুদা কমিশনের হাত ধরে এই ইতিহাসের শুরু। এই কমিশন একটি ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার সুপারিশ করেছিল। এতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় জোর দেওয়ার কথা ছিল। প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার প্রস্তাব ছিল। স্নাতক ডিগ্রি চার বছর মেয়াদি করার সুপারিশও ছিল। সেই সময়ের বিবেচনায় এটি ছিল আধুনিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। যদিও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ১৯৭৫ সালে সরকার পতনের মধ্য দিয়ে থমকে যায় শিক্ষা সংস্কারের পুরো প্রক্রিয়াও।
এরপর একের পর এক কমিশন, কমিটি ও নীতি পর্যালোচনা এসেছে। এগুলোর অনেকটাই আগের প্রতিবেদনের ভাবনা নতুন করে তুলে ধরেছে মাত্র। কুদরাত-ই-খুদা কমিশন বাধ্যতামূলক শিক্ষা বাড়ানোর কথা বলেছিল। পাঠ্যক্রম সংস্কার, বৃত্তিমূলক শিক্ষার পথ, উন্নত শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক মূল্যায়ন পদ্ধতির আহ্বানও জানিয়েছিল। ১৯৭৬ সালের পাঠ্যক্রম কমিটি এবং ১৯৭৯ সালের অন্তর্বর্তী শিক্ষানীতি এই প্রস্তাবগুলোকে পরিমার্জিত করে। আজকের শিক্ষাকাঠামোর অনেকটাই তৈরি হয়েছে সেই ভিত্তির ওপর।
এরপর আরও কমিটি ও কমিশন এসেছে। এসবের অন্যতম হলো- মফিজউদ্দিন আহমদ কমিশন (১৯৮৭), শামসুল হক কমিশন (১৯৯৭), এম এ বারী কমিটি (২০০১), মনিরুজ্জামান মিঞা কমিশন (২০০৩) এবং কবির চৌধুরী কমিটি (২০০৯)। যুগ যুগ ধরে গড়ে উঠা প্রতিটি কমিশনই ফিরে গেছে একই ধাঁচে। বাধ্যতামূলক শিক্ষার মেয়াদ বাড়ানো, শিক্ষকদের পেশাদারিত্ব বাড়ানো, পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ, বৃত্তিমূলক শিক্ষার সংযুক্তি, প্রশাসনিক সংস্কার এবং একটি স্থায়ী তদারকি প্রতিষ্ঠান গঠনের সুপারিশ ঘুরেফিরে এসেছে প্রতিটি প্রতিবেদনে।
শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরাও বলছেন, সময়ের সঙ্গে সুপারিশের খুঁটিনাটি বদলালেও মূল দিকনির্দেশ বদলায়নি। চার দশক ধরে একের পর এক গঠন করা কমিশন ঘুরপাক খেয়েছে একই চিন্তায়, একই ধরনের সমস্যা চিহ্নিত করতে। শুধু তাই নয়, কমিশনগুলো একই ধরনের প্রস্তাবনা দিলেও তা-ও বাস্তবায়ন হয়েছে অসঙ্গতভাবে; যার অধিকাংশই থমকে গেছে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে কারণে। আবার অনেক সুপারিশ শুধু পরের কমিশনের প্রতিবেদনে ফিরে এসেছে।
২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি ছিল এসবের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রচেষ্টা। এটি আওয়ামী লীগ সরকার গ্রহণ করেছিল। এই নীতি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হয়নি। তবু এর অনেক মূল প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন থমকে গেছে। প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়নি। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিকে স্কুলের অন্তর্ভুক্ত করে মাধ্যমিক শিক্ষা পুনর্গঠন করা হয়নি। শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো চালু হয়নি। স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ কমিশনও গঠিত হয়নি। কোনো সমন্বিত শিক্ষা আইন পাস হয়নি। স্থায়ী শিক্ষা কমিশনও তৈরি হয়নি।
তবে একটি পরিবর্তন সত্যিই ঘটেছিল, ২০২২ সালের পাঠ্যক্রম সংশোধন। শেষ আওয়ামী লীগ সরকার এটি দ্রুত বাস্তবায়ন করেছিল। নতুন কাঠামোয় শিখন ক্ষেত্র নতুনভাবে সাজানো হয়। একাদশ শ্রেণির আগে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাজন তুলে দেওয়া হয়। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষার বদলে চালু হয় ধারাবাহিক মূল্যায়ন। ধারণাগতভাবে এতে আন্তর্জাতিক সংস্কারের যুক্তিসংগত উপাদান ছিল। কিন্তু বাস্তবায়নে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
আমাদের এত এত কমিশন হয়েছে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতির পর্যায়ে পৌঁছাতে পারিনি। কমিশনগুলো চিত্তাকর্ষক যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ দিয়ে গঠন হয়। এই কমিশন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর সমস্যা চিহ্নিত করে। সমাধান প্রস্তাব করে। তারপর জমা দেয় চিন্তাশীল সুপারিশে ভরা একটি প্রতিবেদন। তারপর কিছুই ঘটে না। আবার সুপারিশগুলো এমনভাবে আংশিক বাস্তবায়ন হয়; যা নতুন সমস্যার জন্ম দেয়।-অধ্যাপক এম রিজওয়ান খান, সাবেক উপাচার্য, ইউআইইউ
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন পাঠ্যক্রমের বাস্তবায়ন কার্যত থমকে যায়। স্কুলগুলোয় তৈরি হয় না অনিশ্চয়তা; কী পড়াবে এবং কীভাবে মূল্যায়ন করবে তা নিয়েও দেখা দেয় নানা সংকট। ২০২৫ সালে এইচএসসি পাসের হার নেমে আসে ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশে। এটি দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এসএসসি পাসের হারও নেমে যায় ষোলো বছরের সর্বনিম্নে। কর্মকর্তারা এর জন্য দায়ী করেন সহানুভূতিশীল মূল্যায়ন প্রথা তুলে দেওয়াকে। কিন্তু বাস্তবে এই সহানুভূতিশীল মূল্যায়নই এতদিন আড়াল করে রেখেছিল, শিক্ষার্থীরা আসলে কতটা কম শিখছে।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ অন্তত আটটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেছে। প্রতিটি কমিশন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে রূপান্তরের। প্রতিটি কমিশন তৈরি করেছে বিস্তারিত সুপারিশ। কিন্তু প্রতিটিকেই অনেকাংশে উপেক্ষা করা হয়েছে।
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এম রিজওয়ান খান বলেন, আমাদের এত এত কমিশন হয়েছে, কিন্তু আমরা কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতির পর্যায়ে পৌঁছাতে পারিনি।
এই শিক্ষাবিদের মতে, এই ধরনটি হতাশাজনকভাবে একই রকম। একটি কমিশন গঠিত হয়, প্রায়ই চিত্তাকর্ষক যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ দিয়ে। এই কমিশন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর সমস্যা চিহ্নিত করে। সমাধান প্রস্তাব করে। তারপর জমা দেয় চিন্তাশীল সুপারিশে ভরা একটি প্রতিবেদন। তারপর কিছুই ঘটে না। অথবা তার চেয়েও খারাপ কিছু ঘটে, সুপারিশগুলো এমনভাবে আংশিক বাস্তবায়িত হয় যে নতুন সমস্যার জন্ম দেয়।
অধ্যাপক খান বলেন, কমিশনের পর কমিশন সুপারিশ দিয়েছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন খুব কমই হয়েছে। অনেক সময় যথেষ্ট গবেষণা ছাড়াই পরিবর্তন আনা হয়েছে, শুধু এই অনুমানের ভিত্তিতে যে এটা করলে ভালো হবে।
রাজনৈতিক সমস্যা
কমিশনগুলো কেন ব্যর্থ হয়? উত্তর একই সঙ্গে সহজ ও জটিল। সবচেয়ে সহজ উত্তর হলো রাজনীতি। শিক্ষা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তা শুধু শিক্ষাবিদদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় না। রাজনৈতিক বিবেচনা প্রায়ই শিক্ষাগত বিবেচনাকে ছাপিয়ে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, অনেক কমিশনই প্রকৃত অর্থে জাতীয় কমিশন ছিল না। সেগুলো ছিল ক্ষমতাসীন দলের কমিশন। এতে শুধু দলীয় বুদ্ধিজীবী ও দলীয় অনুগতরাই ছিলেন। ফল অনুমেয়। এমন কমিশন রাজনৈতিক স্বার্থের সেবা করে, শিক্ষাগত প্রয়োজনের নয়।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান আরও বলেন, এভাবে কমিশন গঠিত হলে সেটা দেশের কমিশন হয়ে ওঠে না। তারপর সরকার বদলালে পরবর্তী সরকার সবকিছু বাতিল করে নতুন করে শুরু করে। অনেক কমিশনই প্রকৃত অর্থে জাতীয় কমিশন ছিল না। সেগুলো ছিল ক্ষমতাসীন দলের কমিশন। এতে শুধু দলীয় বুদ্ধিজীবী ও দলীয় অনুগতরাই ছিলেন। ফল অনুমেয়। এমন কমিশন রাজনৈতিক স্বার্থের সেবা করে, শিক্ষাগত প্রয়োজনের নয়।
অনেক কমিশনই প্রকৃত অর্থে জাতীয় কমিশন ছিল না। সেগুলো ছিল ক্ষমতাসীন দলের কমিশন। এতে শুধু দলীয় বুদ্ধিজীবী ও দলীয় অনুগতরাই ছিলেন। ফল অনুমেয়। এমন কমিশন রাজনৈতিক স্বার্থের সেবা করে, শিক্ষাগত প্রয়োজনের নয়। এভাবে কমিশন গঠিত হলে সেটা দেশের কমিশন হয়ে ওঠে না। তারপর সরকার বদলালে পরবর্তী সরকার সবকিছু বাতিল করে নতুন করে শুরু করে।- মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, অধ্যাপক, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
গবেষণার ঘাটতি
এসবের বাইরে আরেকটি সমস্যা হলো– কমিশনগুলো প্রায়ই যথেষ্ট গবেষণা করে না। অধ্যাপক এম রিজওয়ান খান ব্যাখ্যা করে বলেন, শিক্ষায় যেকোনো পরিবর্তন আনতে গেলে চরম সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পনা, গবেষণা ও মূল্যায়ন করতে হয়। আমরা কি ভেবেছিলাম বাস্তবায়নে কী কী সমস্যা দেখা দিতে পারে? আমাদের অবকাঠামো কি প্রস্তুত ছিল? আমাদের শিক্ষকরা কি প্রশিক্ষিত ছিলেন? প্রায়ই উত্তরটা হয় না।
অধ্যাপক খান আরও বলেন, আমরা একের পর এক পরিবর্তন করে গেছি। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন, মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন, পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন। কিন্তু আমরা কখনো এর দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি মূল্যায়ন করিনি।
প্রেক্ষাপট না বুঝে মডেল নকল করা আমাদের দীর্ঘদিনের প্রবণতা। আমরা প্রায়ই মনে করি, কোনো দেশ একটা ভালো ব্যবস্থা গড়ে তুললে আমরা শুধু সেটা গ্রহণ করেই আমাদের সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারি। কিন্তু বিষয়টা অত সহজ নয়। প্রতিটি সমাজই নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ভূগোল ও সামাজিক বাস্তবতার ওপর গড়ে ওঠে।- অধ্যাপক মো. কামরুল আহসান, উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
খাপ খাওয়াতে ব্যর্থতা
কমিশনগুলোর আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হচ্ছে বিদেশি মডেল না বুঝে গ্রহণ করা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, আমরা প্রায়ই প্রেক্ষাপট না বুঝেই অন্য দেশের মডেল আমদানি করি। কেউ ইংল্যান্ড, জার্মানি বা ফিনল্যান্ডে একটা ভাল নীতি দেখে সেটা বাংলাদেশের জন্য মানিয়ে নিতে চায়। কিন্তু এই অভিযোজন ব্যর্থ হয়। কারণ কী? কারণ বাংলাদেশ ইংল্যান্ড নয়। বাংলাদেশ জার্মানি নয়। বাংলাদেশ ফিনল্যান্ডও নয়।
অধ্যাপক আমানুল্লাহ ব্যাখ্যা করে বলেন, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফিনল্যান্ডে যে নীতি কাজ করে, তা এখানে অন্ধভাবে প্রয়োগ করা যায় না।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানও একই কথা বলছেন। তিনি বলেন, প্রেক্ষাপট না বুঝে মডেল নকল করা আমাদের দীর্ঘদিনের প্রবণতা।
অধ্যাপক আহসান বলেন, আমরা প্রায়ই মনে করি, কোনো দেশ একটা ভালো ব্যবস্থা গড়ে তুললে আমরা শুধু সেটা গ্রহণ করেই আমাদের সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারি। কিন্তু বিষয়টা অত সহজ নয়। প্রতিটি সমাজই নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ভূগোল ও সামাজিক বাস্তবতার ওপর গড়ে ওঠে।
আমরা যখন অন্য দেশের একটা ভালো নীতি দেখি আর সেটা বাংলাদেশের জন্য মানিয়ে নিতে চাই, তখন সেই অভিযোজন ভালোভাবে কাজ করে না। এটা আমাদের সাংস্কৃতিক ও আর্থসামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে, কিংবা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে মেলে না। ফলাফল হয় এমন এক কাগুজে নীতি, যা দেখতে ভালো, কিন্তু বাস্তবে ব্যর্থ হয়।- অধ্যাপক শামস্ রহমান, উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
অভিযোজনের সমস্যা
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক শামস্ রহমান বিষয়টি আরও বিস্তারিত করে বলেন, আমরা যখন অন্য দেশের একটা ভালো নীতি দেখি আর সেটা বাংলাদেশের জন্য মানিয়ে নিতে চাই, তখন সেই অভিযোজন ভালোভাবে কাজ করে না। এটা আমাদের সাংস্কৃতিক ও আর্থসামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে, কিংবা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে মেলে না। ফলাফল হয় এমন এক কাগুজে নীতি, যা দেখতে ভালো, কিন্তু বাস্তবে ব্যর্থ হয়।
অধ্যাপক আমানুল্লাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেন। তিনি বলেন, এই কমিশনগুলোর সদস্যদের প্রায়ই মাটির সঙ্গে সংযোগ থাকে না।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, এর একটা বড় কারণ আছে। অনেক কমিশন সদস্যের মাটি ও মানুষের সঙ্গে সামান্যই সংযোগ থাকে। তাঁদের হয়তো আমেরিকা বা অন্য দেশের পিএইচডি ডিগ্রি আছে, কিন্তু তাঁরা বাংলাদেশকে বোঝেন না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বোঝেন না। মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন কী, তা বোঝেন না।
বাস্তবায়নের ঘাটতি
কমিশনগুলোর প্রতিবেদনে অনেক সময় ভাল সুপারিশ করা হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। অধ্যাপক শামস্ রহমান বলেন, কমিশনগুলোর প্রস্তাব খুবই উচ্চাভিলাষী ছিল। তারা কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে চেয়েছিল। কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য অর্থায়ন দরকার। বাংলাদেশ শিক্ষায় ব্যয় করে জিডিপির ২ শতাংশেরও কম। এটি বিশ্বের সর্বনিম্ন হারগুলোর একটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মনিনুর রশিদ মনে করেন, স্বল্প বাজেটে বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় না। তবে অর্থই একমাত্র সমস্যা নয়। সমন্বয়েরও ঘাটতি রয়েছে।
সমন্বয় জটিলতার কথা বলছেন অধ্যাপক শামস্ রহমানও। তিনি বলেন, কেউ কাজ করছেন প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে, কেউ মাধ্যমিক নিয়ে, কেউ উচ্চশিক্ষা নিয়ে। সবকিছু খণ্ডবিখণ্ড। সঠিক সমন্বয় নেই।
শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা
দফায় দফায় কমিশন গঠন, নীতি প্রণয়ন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে বিশৃঙ্খলার শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। দেখা গেছে, একটি শিশু ২০১০ সালে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করার সময় নাগাদ সে একাধিক পাঠ্যক্রম পরিবর্তন দেখেছে। নতুন পাঠ্যবই দেখেছে, নতুন পরীক্ষা পদ্ধতি ও নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতিও দেখেছে।
এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ১০-১১টি ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যায়। এটি সংস্কার নয়, এটি বিশৃঙ্খলা। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা তাদের শেখার ওপর ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে না। কারণ ভিত্তিটাই বারবার বদলে যায়। শিক্ষকরাও কোনো শিক্ষণ পদ্ধতিতে দক্ষতা অর্জন করতে পারেন না। কারণ পদ্ধতিও বারবার বদলে যায়।
বাংলাদেশে শিক্ষা কমিশনের অভাব নেই। যা নেই, তা হলো এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। যা নেই, তা হলো সংস্কার টিকিয়ে রাখার ধারাবাহিকতা।প্রতিটি নতুন কমিশন একটি সুযোগ। প্রতিটি নতুন কমিশন একই সঙ্গে একটি সম্ভাব্য ব্যর্থতাও।
সমাধান, নীতির ধারাবাহিকতা
এই চক্র ভাঙতে কী দরকার? অধ্যাপক শামস্ রহমানের কাছে একটি সহজ অথচ শক্তিশালী উত্তর আছে, নীতির ধারাবাহিকতা। তিনি বলেন, আমরা যা ই করি না কেন, নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ নীতি হোক, পাঠ্যক্রম নীতি হোক বা অন্য কিছু, আমাদের ধারাবাহিকতা দরকার।
অধ্যাপক শামস্ রহমান আরও বলেন, আমি আশাবাদী। গত তিন চার মাসে আমাকে বিভিন্ন ফোরামে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমি দেখেছি প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে শিক্ষামন্ত্রী পর্যন্ত সবাই শিক্ষা নিয়ে কথা বলছেন। এটা একটা ভালো লক্ষণ।
একটি সফল কমিশন দেখতে কেমন হবে? এ প্রশ্নে বিশেষজ্ঞদের উত্তরে বিস্ময়করভাবে মিল আছে।
প্রথমত, এটি হতে হবে একটি জাতীয় কমিশন, রাজনৈতিক কমিশন নয়। এতে শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক, সব অংশীজনকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, এতে এমন মানুষ থাকতে হবে যাঁরা পশ্চিমা শিক্ষা এবং উপমহাদেশের শিক্ষা দুটোই বোঝেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আমানুল্লাহর ভাষায়, এমন মানুষ, যারা দুটোকে মেলাতে পারেন।
তৃতীয়ত, এটি হতে হবে গবেষণাভিত্তিক, শুধু ধারণাভিত্তিক নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ সতর্ক করে বলেন, গবেষণা ছাড়া, বিশেষজ্ঞ মতামত ছাড়া, প্রমাণ ছাড়া যদি আমরা শুধু সিদ্ধান্ত নিই, তাহলে তা কাজ করবে না।
চতুর্থত, এতে থাকতে হবে সুনির্দিষ্ট সময়সীমাসহ বাস্তবায়ন পরিকল্পনা। অধ্যাপক আমানুল্লাহ বলেন, ছয় মাসের মধ্যে কী করতে হবে, এক বছরে কী করতে হবে, দুই বছরে কী করতে হবে, তা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে।
পঞ্চমত, এর সঙ্গে থাকতে হবে পর্যাপ্ত অর্থায়ন। অধ্যাপক শামস্ রহমান বলেন, কাঠামোগত বিনিয়োগ ছাড়া কাঠামোগত পরিবর্তন প্রত্যাশা করা যায় না।
শিক্ষা কমিশনে এমন মানুষ থাকতে হবে যাঁরা পশ্চিমা শিক্ষা এবং উপমহাদেশের শিক্ষা দুটোই বোঝেন। এমন মানুষ, যারা দুটোকে মেলাতে পারেন।- অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ, উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে শিক্ষা কমিশনের অভাব নেই। যা নেই, তা হলো এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। যা নেই, তা হলো সংস্কার টিকিয়ে রাখার ধারাবাহিকতা।প্রতিটি নতুন কমিশন একটি সুযোগ। প্রতিটি নতুন কমিশন একই সঙ্গে একটি সম্ভাব্য ব্যর্থতাও।
তাদের প্রশ্ন, পরবর্তী কমিশন কি এই ধারা ভাঙবে? নাকি যোগ দেবে সেই দীর্ঘ তালিকায়, যেখানে সদিচ্ছাসম্পন্ন উদ্যোগগুলো সামান্যই ফল দিয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে না কমিশনের ওপর। এটি নির্ভর করে এর ওপর, বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত রাজনীতির ঊর্ধ্বে শিক্ষাকে স্থান দিতে প্রস্তুত কি না।
এই ধারাবাহিকের পরবর্তী পর্বে এক বাংলাদেশে শিক্ষার বহু ধারা তুলে ধরা হবে।