ফান্ডে টাকা নেই, জুনেও মে মাসের বেতন পাবেন না মাদ্রাসা শিক্ষকরা?
বেসরকারি এমপিওভুক্ত মাদ্রাসায় কর্মরত এমপিওভুক্ত প্রায় দুই লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর মে মাসের বেতন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ফান্ডে টাকা থাকায় চলতি জুন মাসেও তাদের মে মাসের বেতন পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের দাবি, মে মাসের বেতন দিতে ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার পাঠানো হয়েছে। অর্থ ছাড় করার চেষ্টা করছেন তারা।
জানা গেছে, বর্তমানে দেশে এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা রয়েছে ৮ হাজার ২২৯টি। এর মধ্যে দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পর্যায়ের মাদ্রাসা যথাক্রমে ৫ হাজার ৭৬৭, ১ হাজার ২৮৫টি ও ফাজিল ৯৯৩টি ও ১৮৪টি। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তবে তারা কেউই এখনো মে মাসের বেতন পাননি।
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল আজহার পূর্বে মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের মে মাসের বেতন প্রস্তুত করা হয়েছিল। ঈদের ছুটি শুরুর পূর্বেই সেটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা ছিল। তবে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. উবায়দুল হক সে সময় সেটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অনুমতি দেননি। পরবর্তীতে ঈদের ছুটি শেষে জুন মাসে বেতনের প্রস্তাব পাঠানো হলেও ফান্ডে টাকা না থাকায় বেতনের প্রস্তাব অনুমোদন দিচ্ছে না মন্ত্রণালয়।
সূত্রের তথ্য বলছে, জুন মাসের শুরুতে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ফান্ডে থাকা টাকা তুলে নেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। এটি শুধু এই বিভাগের ক্ষেত্রে নয়; প্রতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পূর্বে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের অবশিষ্ট টাকা তুলে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে সেই উদ্বৃত্ত অর্থ নতুন অর্থবছরের বাজেটে যুক্ত করা হয়। এজন্য মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনের অর্থ দিতে পারছে না অর্থ মন্ত্রণালয়।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমরা বেতনের সবকিছু ঈদের আগেই প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে চেয়েছিলাম। ওই সময় প্রস্তাব পাঠাতে পারলে বেতন নিয়ে এমন বিড়ম্বনা তৈরি হত না। তবে পাঠানো সম্ভব হয়নি। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ফান্ডে টাকা নেই। বাজেট ঘোষণা হয়ে যাওয়ায় নতুন করে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ দেওয়ারও সম্ভাবনা নেই। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীরা জুনে মে মাসের বেতন পাবেন না বলেই মনে হচ্ছে।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. উবায়দুল হকের দপ্তরে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার এবং হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের মে মাসের বেতন না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অর্থ সচিব বরাবর ডিও, সাড়া মিলছে না
ফান্ডে টাকা না থাকায় মাদ্রাসায় কর্মরত ১ লাখ ৯১ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর মে মাসের বেতনের অর্থ যোগান দিতে অর্থ বিভাগের সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার বরাবর ডিও লেটার পাঠায় কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ। প্রায় আটদিন হতে চললেও এখনো এই চিঠির সাড়া মেলেনি বলে জানা গেছে।
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়ার পাঠানো ডিও লেটারে বলা হয়েছে, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) সম্প্রতি মাদ্রাসা ১৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে। তাদের বেতন-ভাতা দেওয়ার কারণে বাজেট ঘাটতি পড়েছে। এজন্য নতুন করে টাকা প্রয়োজন। বিষয়টি অতীব জরুরি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: বাড়ছে ৫০ শতাংশ বেসিক, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কোন গ্রেডে কত বেতন হবে
তবে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের এই তথ্যের সঙ্গে একমত হতে পারেনি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। একই মন্ত্রণালয়ের ভিন্ন এ বিভাগের আওতায় বেসরকারি স্কুল-কলেজেও কয়েক হাজার শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে। তবে তারা ইতোমধ্যে বেতন-ভাতা ছাড় করেছে। ফলে এনটিআরসিএর শিক্ষক নিয়োগের কারণে বাজেটে ঘাটতি পড়েছে—বিষয়টি মানতে নারাজ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার পর নভেম্বর মাসে সম্পূরক বাজেট হয়। সেখানে নিয়োগসহ অন্যান্য বিষয় থাকে। ফলে কার বিভাগে বেতন-ভাতা বাবদ কত টাকা লাগবে সেটি তখনই উল্লেখ করতে হয়। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের বাজেট ঘাটতির বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। এটি খামখেয়ালির কারণে হয়েছে।
প্রয়োজন সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা, যা বলছে অর্থ মন্ত্রণালয়
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১ লাখ ৯১ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর মে মাসের বেতন দিতে প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। বিষয়টি সমাধানে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ বিভাগের বাজেট-২ শাখার উপসচিব শিহাব উদ্দিন আহমদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ডিও লেটার দিয়ে থাকলে বিষয়টি সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিষয়ে সচিব স্যার ভালো বলতে পারবেন।’
বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য জানতে অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।