১৮ মে ২০২৬, ১৩:৪৬

বিশ্বের সবচেয়ে কম অবৈতনিক শিক্ষা বাংলাদেশে, সেটাও নামমাত্র— বাস্তবে খরচ বহন করে পরিবারই

স্কুল শিক্ষার্থীদের প্রতীকী ছবি  © ফাইল ফটো

ইউনেস্কোর 'ওয়ার্ল্ড এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৫' অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাত্র পাঁচ বছরের অবৈতনিক শিক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। এই সূচকে বৈশ্বিক তালিকাতেও দেশের অবস্থান একেবারেই তলানিতে। একই অঞ্চলের ও সমপর্যায়ের অর্থনৈতিক প্রতিবেশী দেশগুলো যেখানে দীর্ঘ মেয়াদে অবৈতনিক শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। গবেষকদের মতে, এই সমস্যার পেছনের কারণগুলো স্পষ্ট হলেও তা সমাধানে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে।

ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিকস এবং এডুকেশন ডাটা অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্স কমিশনের তৈরি এই প্রতিবেদনে প্রতিটি দেশের 'ইয়ার্স অফ গ্যারান্টিড এডুকেশন প্রোগ্রাম' (ওয়াইজিইপি) পরিমাপ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই পরিসংখ্যানের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সরকার কর্তৃক কত বছর অবৈতনিক শিক্ষা দিতে আইনত বাধ্য, তা প্রকাশ পেয়েছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা মাত্র পাঁচ বছর বা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। 

এই অবস্থান বাংলাদেশকে বৈশ্বিক তালিকার সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে এনেছে, যেখানে এর সঙ্গী পশ্চিম আফ্রিকার টোগো এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিয়ানমার ও ভিয়েতনামের মতো দেশ। অপরদিকে, তালিকার শীর্ষস্থানে থাকা অস্ট্রেলিয়া, মরিশাস, সান মারিনো এবং লিচেনস্টাইনের মতো দেশগুলো ১৩ বছরের অবৈতনিক শিক্ষার নিশ্চয়তা দেয়।

সরকারের কাছে শিক্ষা কখনোই প্রকৃত অগ্রাধিকার পায়নি। তারা কেবল বাধ্যবাধকতা থেকে কাজ করে, সঠিক বাস্তবায়নের সদিচ্ছা থেকে নয়ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কেবল দক্ষিণ এশিয়ার ভেতরেই এই ব্যবধান অত্যন্ত প্রকট

দক্ষিণ এশিয়া : অবৈতনিক শিক্ষার নিশ্চয়তার মেয়াদকাল

দেশ অবৈতনিক শিক্ষার সময়
শ্রীলঙ্কা  ১৩ বছর
পাকিস্তান ১২ বছর
আফগানিস্তান ১২ বছর
মালদ্বীপ ১২ বছর
নেপাল  ১২ বছর
ভুটান  ১১ বছর
ভারত ৮ বছর (অষ্টম শ্রেণি)
বাংলাদেশ  ৫ বছর (পঞ্চম শ্রেণি)


দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত ও বাংলাদেশ ছাড়া বাকি সব দেশেই মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। এমনকি ভারতও বাংলাদেশের চেয়ে তিন বছর বেশি অর্থাৎ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এই সুবিধা দিয়ে থাকে।

২০১০ সালের যেই নীতি কখনো বাস্তবায়ন হয়নি

এই সমস্যাটি নতুন নয় এবং এটি যে নীতি নির্ধারণী মহলের কাছে অজানা, তাও নয়। ২০১০ সালে পাস হওয়া বাংলাদেশের 'জাতীয় শিক্ষানীতিতে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাকে পঞ্চম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ ১৫ বছর পরও সেই প্রস্তাব কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ সরকারের সমালোচনা করে একটি মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন।

তিনি বলেন, সরকারের কাছে শিক্ষা কখনোই প্রকৃত অগ্রাধিকার পায়নি। তারা কেবল বাধ্যবাধকতা থেকে কাজ করে, সঠিক বাস্তবায়নের সদিচ্ছা থেকে নয়।

একটি শিশু যদি স্কুলে না যেত, তবে হয়তো সে কোনো চায়ের দোকানে বা কৃষিকাজে শ্রম দিয়ে টাকা আয় করত। সেই হারিয়ে যাওয়া আয়টাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমি শিশুটিকে কাজে না পাঠিয়ে স্কুলে আসতে বাধ্য করছি। অথচ পরিবারের সেই আয়ের প্রয়োজন ছিলঅধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

তিনি উল্লেখ করেন যে, বাধ্যতামূলক শিক্ষার মেয়াদ বাড়ানো কেবল কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এর জন্য প্রয়োজন আর্থিক বরাদ্দ, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, ভৌত অবকাঠামো এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করবে। দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলেই এই ধরনের সম্প্রসারণ টিকিয়ে রাখার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি এবং মাধ্যমিক শিক্ষাকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত রূপান্তর করার পরিকল্পনা সরকারের ছিল। কিন্তু এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য যে আর্থিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রস্তুতি দরকার, তা ছিল না।’

নামমাত্র অবৈতনিক, বাস্তবে নয়
এই সমস্যার জটিলতার লুকিয়ে রয়েছে এর সংজ্ঞাতেই। ইউনেস্কো যখন বাংলাদেশের অবৈতনিক শিক্ষার বছর গণনা করে, তখন তারা মূলত টিউশন ফি মওকুফ এবং বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণকে বিবেচনায় নেয়। এই প্রায়োগিক দিক থেকে বিবেচনা করলে, বাংলাদেশ কেবল পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা দেয়। তবে গবেষকদের মতে, এই শ্রেণীকরণটি পরিবারের পক্ষ থেকে হওয়া প্রকৃত খরচকে আড়াল করে দেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর-এর অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান এই ব্যবধান সম্পর্কে বলেন, কাগজে-কলমে বা সরকারিভাবে আমরা হয়তো এটাকে অবৈতনিক বলতে পারি, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। এমনকি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাও পুরোপুরি অবৈতনিক নয়। কারণ শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হলে শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এমনকি তাদের দুপুরের খাবারের দায়িত্বও নিতে হবে।

খাতা, কলম, যাতায়াত, প্রাইভেট কোচিং এবং খাবারের খরচ পরিবারগুলোকেই বহন করতে হয়। একটি নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য এই খরচগুলো বহন করা অসম্ভব। তবে সমস্যাটি কেবল এই খরচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অধ্যাপক মজিবুর রহমান বাংলাদেশের শিক্ষা নীতির আলোচনায় সচরাচর দেখা যায় না, এমন একটি ধারণা তুলে ধরেছেন, তা হলো— 'সুযোগ ব্যয়' (অপরচুনিটি কস্ট)।

তিনি বলেন, একটি শিশু যদি স্কুলে না যেত, তবে হয়তো সে কোনো চায়ের দোকানে বা কৃষিকাজে শ্রম দিয়ে টাকা আয় করত। সেই হারিয়ে যাওয়া আয়টাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমি শিশুটিকে কাজে না পাঠিয়ে স্কুলে আসতে বাধ্য করছি। অথচ পরিবারের সেই আয়ের প্রয়োজন ছিল।

ভিত্তি যদি শুরু থেকেই দুর্বল হয়, তবে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার প্রতিটি স্তরেই সেই দুর্বলতা বয়ে বেড়ায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এর প্রমাণ পাওয়া যায়, যেখানে প্রায় ৯০% আবেদনকারী ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হনড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় উপবৃত্তি এবং শর্তাধীন অর্থ সহায়তার ব্যবস্থা থাকলেও, একটি শিশু কাজে না গিয়ে স্কুলে থাকলে পরিবারের যে ক্ষতি হয়, তার তুলনায় এই সহায়তা অত্যন্ত অপ্রতুল। যতক্ষণ না এই শূন্যতা পূরণ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা করা হচ্ছে, ততক্ষণ কেবল আইন করে বাধ্য করলে ঝরে পড়ার হারই বাড়াবে, শিক্ষার হার নয়।

শিক্ষক সংকট
উভয় বিশেষজ্ঞই একমত যে, শিক্ষাবর্ষ এবং গ্রেড নিয়ে যে বিতর্ক— এটা আসল বিষয়টাকে আড়াল করে দেয়: শিক্ষার মান বজায় না থাকলে মেয়াদের কোনো মূল্য নেই। আর বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এই মান পুরোপুরি শিক্ষকের ওপর নির্ভর করে।

ড. মনিনুর রশিদ এই সমস্যাটিকে শিক্ষার ফলাফলের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। পঞ্চম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী যদি দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির স্তরে পারফর্ম করে, তবে তার শিক্ষার মেয়াদ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাড়িয়ে লাভ নেই। এটি কেবল ব্যবধানটিকে শিক্ষাব্যবস্থার ওপরের স্তরে ঠেলে দেয়। তিনি বলেন, ভিত্তি যদি শুরু থেকেই দুর্বল হয়, তবে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার প্রতিটি স্তরেই সেই দুর্বলতা বয়ে বেড়ায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এর প্রমাণ পাওয়া যায়, যেখানে প্রায় ৯০% আবেদনকারী ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হন।

এর অর্থ খুব স্পষ্ট : শ্রেণিকক্ষের ভেতরের মান উন্নয়ন না করে কেবল অবৈতনিক শিক্ষার বছর বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে উন্নতি করা সম্ভব, কিন্তু শিক্ষার আসল সমস্যার সমাধান হবে না।

অধ্যাপক মজিবুর রহমান, শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের এই পেশায় ধরে রাখার ক্ষেত্রে কাঠামোগত ব্যর্থতার কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে, বিসিএস পরীক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষকতা পেশা খুব কমই প্রথম পছন্দ করে থাকে। মেধাবীরা অন্য পেশায় চলে যান। আর যারা শিক্ষকতায় আসেন, তাদের অনেকের মধ্যেই প্রকৃত অনুপ্রেরণার অভাব থাকে।

তিনি বলেন, দেশের সেরা মেধাবীরা কেন শিক্ষকতায় আসবেন না? কারণ আমরা তাদের প্রয়োজনীয় সুবিধা বা প্রণোদনা দিই না। অনেকেই পছন্দের পেশা হিসেবে না, ভাগ্যচক্রে শিক্ষক হন। কেউ যদি অনিচ্ছাকৃত শিক্ষকতায় আসেন, তবে স্বাভাবিকভাবেই তার কাজের প্রতি অনুপ্রেরণা থাকবে না।

শিক্ষকদের জন্য একটি পৃথক বেতন কাঠামো তৈরি করা, সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা এবং শিক্ষকতা পেশায় প্রকৃত ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ তৈরি করাকে অধ্যাপক মজিবুর রহমান যেকোনো সংস্কার কর্মসূচির জন্য মূল বিষয় বলে মনে করেন, গৌণ কিছু নয়।

বাজেটের প্রশ্ন
সরকার বারবার শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার মধ্যে জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ দেওয়ার অঙ্গীকারও রয়েছে। তবে অধ্যাপক মজিবুর রহমান কেবল বাজেট বাড়ানোর মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, আমরা যদি বাজেট বাড়াইও, কিন্তু সেখানে যদি বিদ্যুৎ বা ওয়াই-ফাই না থাকে, তবে স্মার্ট ডিভাইস কিনে কী লাভ? আসল প্রশ্ন হলো, আমরা সঠিক জায়গায় টাকা খরচ করছি কি না।

দেশের সেরা মেধাবীরা কেন শিক্ষকতায় আসবেন না? কারণ আমরা তাদের প্রয়োজনীয় সুবিধা বা প্রণোদনা দিই না। অনেকেই পছন্দের পেশা হিসেবে না, ভাগ্যচক্রে শিক্ষক হন। কেউ যদি অনিচ্ছাকৃত শিক্ষকতায় আসেন, তবে স্বাভাবিকভাবেই তার কাজের প্রতি অনুপ্রেরণা থাকবে না অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

তার এই উদ্বেগ একটি বৃহত্তর চিত্রকে প্রতিফলিত করে : শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং শিশুদের স্কুলে আসার মতো বস্তুগত পরিস্থিতি তৈরি করার মতো দীর্ঘমেয়াদি ও কঠিন কাজের তুলনায় দৃশ্যমান ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগে বিনিয়োগের প্রবণতাই বেশি দেখা যায়।

ড. মনিনুর রশিদ অস্ট্রেলিয়ার উদাহরণ টেনে বলেন, যেখানে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেখানে এই বাধ্যবাধকতার পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় সহায়তা। যেখানে, বিনামূল্যে বই ও খাতা-পত্র, কল্যাণমূলক ভাতা এবং পরিবারের জন্য আয় সহায়তাও থাকে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে শিক্ষার্থীরা দশম শ্রেণি পর্যন্ত বই পেতে পারে, কিন্তু সেটিই যথেষ্ট নয়। যে পরিবারের খাবার নেই, কর্মসংস্থান নেই এবং আয়ের কোনো উৎস নেই, সেই পরিবারের একটি শিশু কেন স্কুলে আসবে?’

প্রকৃত সংস্কারের জন্য যা প্রয়োজন
ইউনেস্কোর এই র‍্যাংকিং বা বৈশ্বিক অবস্থান নিজে থেকেই বদলে যাবে না। অবৈতনিক শিক্ষার আইনি নিশ্চয়তা পঞ্চম শ্রেণি থেকে বাড়িয়ে অষ্টম শ্রেণি বা তার ওপরের স্তরে উন্নীত করার জন্য একটি নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন। তবে গবেষকদ্বয়ের মতে, কেবল নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।

ড. মনিনুর রশিদ ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ধাপে ধাপে এগোনোর পক্ষে মত দিয়েছেন- প্রথমে বর্তমান স্তরের শিক্ষার মান নিশ্চিত করা, তারপর তার সম্প্রসারণ করা। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথমে বর্তমান স্তরের শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি স্তরেই যেন সঠিক শিখনফল (লার্নিং আউটকাম) অর্জিত হয়, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার।’

অন্যদিকে, অধ্যাপক মজিবুর রহমান দেশকে একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যা এ পর্যন্ত কোনো সরকারই স্পষ্টভাবে উত্থাপন করেনি। আর তা হলো- শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কী?

তিনি বলেন, আমরা কি কেবল শ্রমিক বা চাকর তৈরি করতে চাই? নাকি নেতৃত্ব তৈরি করতে চাই? শিক্ষার মাধ্যমে আমরা কেমন মানুষ তৈরি করতে চাই, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের আগে খুঁজতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সরকারই সামগ্রিকভাবে এবং আন্তরিকতার সাথে এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করেনি।

যতক্ষণ না এই প্রশ্নের উত্তর মিলছে, অবৈতনিক শিক্ষার বছর বাড়ানোর যেকোনো পদক্ষেপ কেবলই একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে। এটি কতটুকু অর্থবহ হবে, তা নির্ভর করবে এমন কিছু সিদ্ধান্তের ওপর, যা নেওয়া অত্যন্ত কঠিন এবং যার ফলাফল পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। যেমন— শিক্ষক নীতিমালা, সামাজিক কল্যাণমূলক সহায়তা, পাঠ্যক্রমের সামঞ্জস্য এবং এমন একটি সরকার ব্যবস্থা, যারা শিক্ষাকে কেবল দায়মুক্তির উপায় হিসেবে দেখবে না, বরং একটি সফলভাবে সম্পন্ন করার মতো প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করবে।

বাংলাদেশ অবৈতনিক শিক্ষায় এই অঞ্চলে তালিকার একদম তলানিতে অবস্থান করছে এবং সরকার এটা বহু বছর ধরেই জানে। ইউনেস্কোর তথ্য উপাত্ত এই সত্যটিকে আরও একবার সবার সামনে দৃশ্যমান করে তুলেছে। এরপর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে— সেটি এখন সম্পূর্ণ একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়।