বাংলা কিউআরে যুক্ত হচ্ছে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেনের সুবিধা
চলতি বছরের নভেম্বর থেকে বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার করে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে টাকা পাঠানোর সুযোগ চালু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ খাতে বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়িয়ে ছোট অঙ্কের নগদ লেনদেন কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি হাসপাতালের টিকিট ও বিভিন্ন ফি পরিশোধ, স্কুলের বেতন, শিক্ষার্থীদের ছোটোখাটো কেনাকাটা থেকে শুরু করে সড়ক ও সেতুর টোলও বাংলা কিউআরের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে দৈনন্দিন লেনদেনের বড় একটি অংশ ডিজিটাল ব্যবস্থায় আসবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গতকাল বুধবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বাংলা কিউআর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তুলতে আগামী তিন মাসে বাংলা কিউআর নিয়ে একাধিক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে কিছু পদক্ষেপ আগামীকাল ১ অক্টোবর থেকে, কিছু ১ নভেম্বর থেকে এবং আরও কিছু নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে বছরের শেষ নাগাদ কার্যকর হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বাংলা কিউআরের ব্যবহার আরও দ্রুত বাড়বে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত জুনের তুলনায় ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সাড়ে তিন গুণ। একই সময়ে লেনদেনের অর্থমূল্য বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। বর্তমানে বাংলা কিউআর ব্যবহারকারী মার্চেন্টের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখে পৌঁছেছে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, দেশের অর্থনীতির বড় অঙ্কের লেনদেন ইতোমধ্যে নগদবিহীন পদ্ধতিতে হচ্ছে। তবে মুদি দোকান, বাজারসহ দৈনন্দিন ছোট অঙ্কের লেনদেন এখনো মূলত নগদনির্ভর। এসব লেনদেন ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনা গেলে অর্থনীতির প্রতিটি লেনদেনের একটি ডিজিটাল তথ্যচিহ্ন তৈরি হবে। এর ফলে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বড় একটি অংশ আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় আসবে।
তিনি বলেন, নগদ লেনদেনে ভাংতি পাওয়া, পুরোনো বা মলিন নোট নিয়ে বিড়ম্বনাসহ নানা সমস্যা রয়েছে। বাংলা কিউআরের মাধ্যমে এসব সমস্যা কমানো সম্ভব। এতে লেনদেন দ্রুত ও সহজ হওয়ার পাশাপাশি নগদ অর্থ ব্যবহারের প্রয়োজনও কমবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানান, গত ১ জুলাই থেকে সর্বস্তরে বাংলা কিউআর ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা চালু করা হয়েছে। এরপর তিন মাস ধরে বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কোথায় কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে, তা চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন সেসব সমস্যা দূর করতে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, গত জুলাই থেকে বাংলা কিউআরের লেনদেন প্রায় চার গুণ বেড়েছে। সর্বশেষ এক সপ্তাহে এ ব্যবস্থায় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে প্রায় ১৪৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। একই সময়ে মার্চেন্টের সংখ্যাও প্রায় তিন গুণ বেড়ে ৪০ লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
তবে বাংলা কিউআর ব্যবহারে এখনো অন্যতম সমস্যা ফি বা চার্জ। ব্যবসায়ী পণ্য বিক্রির পর প্রাপ্য অর্থের একটি অংশ কেটে রাখা হলে তিনি এ ব্যবস্থায় আগ্রহী হবেন না। তাই মার্চেন্টদের জন্য বাংলা কিউআরকে আরও ব্যয়সাশ্রয়ী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলা কিউআরের বড় সুবিধা এর আন্তঃব্যবহারযোগ্যতা। আগে কোনো মার্চেন্ট নির্দিষ্ট ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার কিউআর ব্যবহার করলে অন্য প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক সেখানে সহজে অর্থ পরিশোধ করতে পারতেন না। এখন একটি অভিন্ন বাংলা কিউআরের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা ও পেমেন্ট সেবা প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক লেনদেন করতে পারবেন।
স্বাস্থ্য খাতে বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে আরিফ হোসেন খান বলেন, হাসপাতালের বহির্বিভাগের টিকিট থেকে শুরু করে বিভিন্ন ফি কিউআরের মাধ্যমে পরিশোধ করা যাবে। এতে ছোট অঙ্কের লেনদেনে ভাংতির সমস্যা ও লাইনে অপেক্ষার সময় কমবে।
শিক্ষা খাতেও বাংলা কিউআর চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্কুলের বেতন, ক্যান্টিনে খাবার কেনা, স্টেশনারি, পেন্সিল, ইরেজার, শার্পনার বা জ্যামিতি বক্স কেনার মতো ছোট লেনদেনও এর মাধ্যমে করা যাবে। বেসরকারি স্কুলের বেতন ক্যাশলেস করার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে এসব অর্থ পরিশোধ বাংলা কিউআরের মাধ্যমে করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
যোগাযোগ খাতেও কিউআর ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন সড়কের টোল প্লাজায় নগদ অর্থের পরিবর্তে কিউআর ব্যবহার করা গেলে টোল আদায়ের সময় কমবে এবং দীর্ঘ লাইনও কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আরিফ হোসেন খান বলেন, যেসব মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন সম্পৃক্ততা বেশি, সেসব জায়গায় ক্যাশলেস ব্যবস্থা চালু করা হলে দ্রুত সুফল পাওয়া সম্ভব। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা দিয়ে বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিজ নিজ অধীন সংস্থাগুলোতে নির্দেশনা দিতে হবে। এতে বাস্তবায়ন আরও দ্রুত হবে।
বাংলা কিউআরকে শুধু অর্থ পরিশোধের একটি মাধ্যম নয়, ক্যাশলেস অর্থনীতির অন্যতম প্রধান অবকাঠামো হিসেবে গড়ে তুলতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, আগামী তিন মাসে নতুন উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন হলে দৈনন্দিন ছোট লেনদেনের বড় একটি অংশ ডিজিটাল ব্যবস্থায় চলে আসবে।