১০০ শিক্ষিত তরুণের ৩৬ জনই বেকার: আইএমএফ
বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত তরুণের মধ্যে ৩৬ জনই বেকার। অর্থাৎ দেশের শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার ৩৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ম্যাগাজিনের সেপ্টেম্বর সংস্করণে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও বেশি শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার তুলনামূলক বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইএমএফ বলছে, এশিয়াজুড়ে তরুণদের বেকারত্বের হার বেশ বেশি। বিশেষ করে যাঁরা তুলনামূলক বেশি শিক্ষিত, তাঁদের মধ্যেই এই হার সর্বোচ্চ। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও অনেক তরুণ তাঁদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি খুঁজে পাচ্ছেন না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপেও তরুণদের বেকারত্বের চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট ২৬ লাখ ২৪ হাজার বেকার রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২০ লাখ ৩২ হাজারই তরুণ-তরুণী, যাঁদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছর।
এই বেকার তরুণদের মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত বা স্নাতক ডিগ্রিধারী। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা শেষ করার পরও বিপুলসংখ্যক তরুণকে কর্মসংস্থানের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
শুধু বেকার তরুণের সংখ্যাই নয়, তাঁরা কতদিন ধরে চাকরির বাইরে রয়েছেন, সেই চিত্রও উদ্বেগের। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, চাকরিপ্রত্যাশী উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের ১৭ শতাংশের বেশি দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বেকার থাকেন। আর ১ থেকে ২ বছর বেকার থাকেন ১৫ শতাংশের বেশি উচ্চশিক্ষিত তরুণ।
অর্থাৎ উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রতি তিনজনের মধ্যে প্রায় একজনকে এক বছরের বেশি সময় বেকার থাকতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো একই চিত্র দেখা যাচ্ছে এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশে। আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রীলঙ্কায় শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ বেকার। ভারতে এই হার ৪০ শতাংশের বেশি। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনে শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার ২০ শতাংশের বেশি।
আইএমএফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষিত তরুণেরা তাঁদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। এর পেছনে শুধু চাকরির সংখ্যা কম থাকাই কারণ নয়; শ্রমবাজারে যে ধরনের দক্ষতার চাহিদা রয়েছে, স্নাতকদের দক্ষতার সঙ্গে তারও একটি স্থায়ী অসামঞ্জস্য রয়েছে।
এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। আইএমএফ বলছে, এআই উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে। তবে কর্মীদের দক্ষতা বাড়ার তুলনায় এআই গ্রহণের গতি বেশি হলে তরুণ কর্মীদের জন্য শ্রমবাজারের চাপ আরও বাড়তে পারে।
বর্তমানে এআইয়ের বিভিন্ন মডেল ব্যবহার করে জটিল অনেক কাজও বিনা মূল্যে করিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বেতনভুক্ত প্রাথমিক পর্যায়ের কারিগরি পদের প্রয়োজন কমে আসছে। এতে বিশেষ করে নতুন স্নাতকদের জন্য চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শ্রমবাজারে এআইয়ের ব্যবহার বাড়তে থাকায় আগামী বছরগুলোতে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের চাকরির সুযোগ কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে আইএমএফ।
তবে সামনে শুধু চাকরির সংকটই নয়, শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। আইএমএফের হিসাবে, আগামী এক দশকে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করবেন।
অর্ধশতাব্দীরও বেশি আগে বিশ্বের উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে কর্মজীবনে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা তরুণ-তরুণীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ কোটি। সেই সংখ্যা এখন অনেক বেড়েছে।
এর আগে গত জুনে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘দ্য গ্লোবাল জবস চ্যালেঞ্জ’ প্রতিবেদনে বলা হয়, এই তরুণ-তরুণীরা সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুবগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করবেন। আগের যেকোনো দশকের তুলনায় এই সংখ্যা বেশি হবে এবং এই শতাব্দীর বাকি সময়ের যেকোনো দশকের পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি হবে।
ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি, শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন এবং এআইনির্ভর পরিবর্তনের সঙ্গে তরুণদের প্রস্তুত করা—আগামী দিনের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।