৯ম পে-স্কেল অনুমোদন, সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার, সর্বনিম্ন ২০ হাজার
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত ৯ম পে-স্কেলের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোতে সর্বোচ্চ গ্রেড-১-এর বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আজ সোমবার (৩১ আগস্ট) অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি এ বিষয়ে ব্রিফ করবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ আলোচনা ও বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার পর নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন গ্রেডের বেতন পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। এরপর আলোচনা শেষে নতুন পে-স্কেলে গ্রেড-১-এর বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে ২০তম গ্রেডে বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর এখন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অনুমোদিত বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
গেজেট প্রকাশের পর নতুন পে-স্কেলের কার্যকর তারিখ, গ্রেডভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামো এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলো আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যাবে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং ভারসাম্যপূর্ণ বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করা হয়েছে।
সবার জন্য মোবাইল ভাতা
নতুন বেতন কাঠামোর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের একটি হলো মোবাইল ভাতার আওতা বাড়ানো। নতুন জাতীয় বেতনস্কেল অনুযায়ী ১ম থেকে ২০তম-সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারী এ ভাতা পাবেন। এত দিন ৫ম গ্রেড পর্যন্ত নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেতেন। সরকারি দপ্তরগুলোতে ই-মেইল, অনলাইন সভা, ডিজিটাল ফাইল ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন অ্যাপভিত্তিক কাজ বাড়ায় প্রায় সব পর্যায়ের কর্মচারীকেই ব্যক্তিগত মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হচ্ছে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ভাতার আওতা বাড়ানো হয়েছে।
কাদের বেতন বেশি বাড়ছে
নতুন বেতন কাঠামোয় পুরোনো পেনশনারদের জন্যও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন (ওআরওপি) এখনই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি এবং এর জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় ২০৩০ সালের মধ্যে এটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর আগে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পেনশন বাড়ানোর নতুন ফর্মুলা অনুমোদন করা হয়েছে। এতে কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা বেশি হারে সুবিধা পাবেন।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৯ হাজার টাকা বা এর কম নিট পেনশন হলে বাড়বে ১০০ শতাংশ; ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বাড়বে ৭৫ শতাংশ; ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বাড়বে ৬৫ শতাংশ; ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বাড়বে ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি হলে বাড়বে ৫৫ শতাংশ। ফলে দীর্ঘদিন আগে অবসর নেওয়া এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা এ সিদ্ধান্তে বেশি সুবিধা পাবেন।
ধাপ তিনটি
নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন আগের তুলনায় ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বাড়বে। তবে পুরো বেতন বৃদ্ধি একবারে কার্যকর হবে না। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সরকারের এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন পরিকল্পনার অন্যতম কারণ একসঙ্গে বিপুল অর্থ ব্যয়ের চাপ এবং মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা।
প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা
নতুন বেতনস্কেলে প্রথমবারের মতো সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসিক ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রতি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য একজন সরকারি কর্মচারী মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অতিরিক্ত পরিচর্যা ও পরিবারের বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উপকৃত হচ্ছেন ৩৩ লাখ
নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ নতুন ব্যবস্থার সুবিধা পাবেন। এ জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে এ ব্যয়ের সংস্থান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে স্বাধীনতা পরবর্তী ৫৫ বছরে দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য মোট ৮ বার পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল, সবশেষটি ছিল ১১ বছর আগে ২০১৫ সালে। এরপর থেকে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট হারে (বর্তমানে পাঁচ শতাংশ) বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বা বেতন বৃদ্ধি হলেও, নতুন করে আর আনুষ্ঠানিক বেতন কাঠামোর ঘোষণা আসেনি। নিয়মিত বেতন বাড়লেও মূলত মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বেতন বৈষম্য দূর করার জন্য নতুন পে-স্কেলের প্রয়োজন হয়।