ঘোষণার ৫ মাস পর হয়েছিল অষ্টম পে স্কেলের বেতন, এবারও কি তাই?
নবম পে স্কেলের বেতনের তারিখ ঘোষণা ঘোষণা হলেও তা কবে থেকে বাস্তবায়ন হবে—এ প্রশ্ন এখন সরকারি চাকরিজীবীদের অন্যতম আলোচনার বিষয়। এ নিয়ে উদ্বেগ-প্রত্যাশার মধ্যেই সামনে আসছে অষ্টম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা।
অষ্টম জাতীয় পে স্কেল ২০১৫ সালের জুলাই মাস থেকে কার্যকর ঘোষণা করা হলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্ধিত বেতন হাতে পান সেই বছরের ডিসেম্বরে। অর্থাৎ ঘোষণার প্রায় পাঁচ মাস পর তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নতুন বেতনের অর্থ জমা হয়। যদিও কার্যকারিতা জুলাই থেকেই গণনা করা হয়েছিল এবং বকেয়া সমন্বয় করে পরবর্তী সময়ে পরিশোধ করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের নির্দেশনা জারি, সফটওয়্যার ও হিসাব ব্যবস্থার হালনাগাদ এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতির মতো একাধিক ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। ফলে ঘোষণা ও বাস্তবায়নের মধ্যে কিছুটা সময়ের ব্যবধান তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, আসন্ন নতুন পে স্কেলের ক্ষেত্রেও কি অষ্টম পে স্কেলের মতো কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে, নাকি এবার দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে? এ বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন সূচির দিকেই এখন তাকিয়ে আছেন লাখো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী।
তথ্য পর্যালোচনা করে দেখে যায়, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পে স্কেল প্রণয়ন করা হয় ১৯৭৩ সালে। সে বছর সর্বনিম্ন বেতন ধরা হয় ১৩০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন করা হয় দুই হাজার টাকা। তখন সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ছিল ১৫.৩৭:১।
এর চার বছর পর ১৯৭৭ সালে গঠন করা হয় ২য় পে কমিশন। এই কমিশন সর্বোচ্চ বেতন ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয় তিন হাজার টাকা, অপরদিকে সর্বনিম্ন বেতন ৭৩ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয় ২২৫ টাকা। এ সময় দুই বেতনের অনুপাত কমে হয় ১৩.৩৩।
এর ৮ বছর পর ১৯৮৫ সালে নতুন পে কমিশন (তৃতীয় কমিশন) গঠিত হয়। এতে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত কমিয়ে করা হয় হয় ১২:১। পাশাপাশি সর্বোচ্চ বেতন দ্বিগুণ করে ৬ হাজার টাকা করা হয়, অপরদিকে সর্বনিম্ন বেতন ১২২.২ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয় ৫০০ টাকা।
৬ বছর পরে গঠিত চতুর্থ পে কমিশন (১৯৯১ সালে) এই বেতন ৮০ শতাংশ বাড়িয়ে ৯০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৬৬.৬৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১০ হাজার করে। এ বছর সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত কিছুটা কমে হয় ১১.১১:১।
দেশে ৫ম পে কমিশন প্রণয়ন হয় ১৯৯৭ সালে। আগের কমিশনের ৬ বছর পর গঠিত এই কমিশন সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ১০:১ এ নামিয়ে আনেন। পাশাপাশি সর্বোচ্চ বেতন ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন বেতন ৬৬.৬৬ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয় দেড় হাজার টাকা।
এর ৮ বছর পর ২০০৫ সালে গঠিত ৬ষ্ঠ পে কমিশন এই বেতন ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে দুই হাজার ৪০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৫৩.৩৩ শতাংশ বাড়িয়ে ২৩ হাজার করে। এ বছর সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত কিছুটা কমে হয় ৯.৫৮:১।
২০০৯ সালে দেশে সপ্তম পে স্কেল ঘোষিত হয়। চার বছর পর প্রণয়ন করা এই স্কেলে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত কিছুটা বেড়ে হয় ৯.৭:১। পাশাপাশি সর্বোচ্চ বেতন ৭৩.৯১ শতাংশ বাড়িয়ে ৪০ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন বেতন ৭০.৮৩ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয় ৪ হাজার ১০০ টাকা।
অনেক আলোচনা সমালোচনার পর ছয় বছর পর ২০১৫ সালে প্রণয়ন করা হয় ৮ম পে স্কেল। এতে ১০১.২২ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয় ৮ হাজার ২৫০ টাকা। আর সর্বোচ্চ বেতন ৯৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৭৮ হাজার করা হয়। এ বছর সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৯.৪৫:১।
এখন নবম পে স্কেল নিয়ে আশায় বুক বাঁধছেন সরকারি কর্মজীবীরা। চাকরিজীবীদের বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত কমিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে অনেকে দাবি তুলেছেন বৈষম্য দূর করতে গ্রেড কমিয়ে বেতনের অনুপাত ১:৪ করা হোক।
কবে যাচ্ছে সুপারিশ, গেজেট কবে?
সেখানে প্রয়োজনীয় ‘সংযোজন-বিয়োজন’ শেষে অনুমোদনের পর নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট জারি করা হবে। ৬ জুলাই জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির সভায় এমন আলোচনা হয়েছে।
সভার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নবম জাতীয় পে স্কেলে মূল বেতন শতভাগ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সব গ্রেডে সমান হারে বেতন বাড়বে না। নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়বে। সচিব কমিটির সুপারিশ পরবর্তী সপ্তাহে মন্ত্রিসভায় উঠবে।
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনার মাধ্যমে সরকারের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ তৈরির লক্ষ্যে গঠিত সচিব কমিটি আগামী সপ্তাহে ফের সভায় বসবে। এরপর সুপারিশ মন্ত্রিসভায় উঠলে অনুমোদনের পর পে স্কেলের গেজেট জারি হবে।
সচিব কমিটির একাধিক সদস্য গণমাধ্যমকে বলেন, যদি আগামী সপ্তাহে মন্ত্রিসভায় সুপারিশ উপস্থাপন করা সম্ভব না হয়, তবে পরের সপ্তাহের সভায় যেন তা পেশ করা যায়, সে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কমিটির সুপারিশগুলো আগের সভায় চূড়ান্ত হয়েছিল। বিচার বিভাগ সংক্রান্ত কিছু কারিগরি দিক সুরাহা করার জন্য অতিরিক্ত সভাটি হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর সম্মতি পেলে প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে।
মন্ত্রিসভা চাইলে সুপারিশ পরিবর্তন, সংযোজন বা বিয়োজন করতে পারবে। সেখানে অনুমোদন মিললে গেজেট জারির পর কার্যকর হবে পে স্কেল। সে হিসেবে ডিসেম্বরের আগেই মিলতে পারে নতুন স্কেলের বেতন। সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না ডিসেম্বরে বেতন পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও।