২২ জুন ২০২৬, ০৯:৪২

ইলিশের উৎপাদন ও ওজন দুটোই কমছে, কারণ কী

ইলিশের উৎপাদন ও গড় ওজন হ্রাস পাচ্ছে  © সংগৃহীত

বাংলাদেশে টানা প্রায় দুই দশক ইলিশের উৎপাদন বাড়ার প্রবণতার পর হঠাৎ করেই গত তিন বছর ধরে মাছটির উৎপাদন কমতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে ইলিশের গড় ওজনও হ্রাস পাচ্ছে যা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে গবেষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।

ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মৎস্য অধিদপ্তর  ২০২০ সালে একটি প্রকল্প শুরু করেছিল, তা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করায় চলতি জুনে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন একটি প্রকল্প গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে সরকারি পর্যায়ে। অন্যদিকে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ইলিশের পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য উন্মোচন করার পর ধারণা করা হয়েছিল যে দেশের ইলিশ সংরক্ষণ, উৎপাদন ও গুণগত মানে বড় উন্নতি আসবে। কিন্তু বাস্তবে উল্টো চিত্রই দেখা যাচ্ছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ বিবিসি বাংলাকে জানান, ২০২১ সাল পর্যন্ত দুই দশকে যেভাবে ইলিশের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বেড়েছিল, নানা কারণে এখন সেই ধারা ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।ইলিশ গবেষক ও মৎস্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. আনিসুর রহমান বলেন, ‘বড় ইলিশ আসতে শুরু করেছিল। কিন্তু হঠাৎ করে কেন উৎপাদন ও ওজন কমতে শুরু করলো, তা চিহ্নিত করা জরুরি। বাজারে এখন ছোট ইলিশ বেশি দেখা যাচ্ছে, বড় ইলিশ কমে যাচ্ছে যা ইলিশের জনসংখ্যার জন্যও বিপজ্জনক।’

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। পাশাপাশি বিশ্বের মোট ইলিশের প্রায় ৬০ শতাংশই বাংলাদেশে উৎপন্ন হয়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে উৎপাদিত মোট ইলিশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই বাংলাদেশে হয়। তবুও হঠাৎ করে উৎপাদন ও গড় ওজন কমে যাওয়ার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

উৎপাদন পরিস্থিত
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২-০৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার মেট্রিক টন। এরপর থেকে গড়ে প্রতিবছরই উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাব এখন বাজারেও দেখা যাচ্ছে। গত দুই বছরে ইলিশের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত সপ্তাহে চাঁদপুরের আড়তে ৯০০ থেকে ৯৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা দামে বিক্রি হয়েছে। ঢাকার কারওয়ান বাজারে ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি গড়ে দুই হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

আরও পড়ুন : মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা, ২ প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক চলছে

এবিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ বলেন, ‘প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা বন্ধসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে উৎপাদন বাড়ছিল, তবে ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে সেই প্রবণতায় হোঁচট লাগে। এছাড়া বড় সাইজের ইলিশ মাঝে মাঝে পাওয়া গেলেও এখন ছোট ও কম ওজনের ইলিশ বেশি ধরা পড়ছে।’  

কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে  ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে হয় ৫ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টন। তবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আনুষ্ঠানিক হিসাব না থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে উৎপাদন ৫ লাখ টনের নিচে নেমে যেতে পারে।

উৎপাদন ও ওজন কমার কারণ কী
ইলিশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি বছর অক্টোবর মাসে ডিম ছাড়ার পর ৬ থেকে ৭ মাস ইলিশ নদীতে থাকে। এরপর নদীর পানি ঘোলা হয়ে গেলে এপ্রিলের শেষ বা মে মাসের প্রথম দিকে তারা সাগরে চলে যায়। বাংলাদেশে ইলিশের প্রধান বিচরণ এলাকা হলো চাঁদপুর সদর ও হাইমচর, মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থেকে জাজিরা পর্যন্ত পদ্মা নদী, মেহেন্দীগঞ্জের গজারিয়া নদী, বরিশাল ও বরগুনার কিছু নদী, ভোলার তেতুলিয়া নদী অঞ্চল। এ অঞ্চলগুলো থেকেই ইলিশ দক্ষিণাঞ্চল হয়ে সাগরের দিকে চলে যায়।

২০০০ সালের পর অতিরিক্ত জাটকা নিধন ও অবৈধ মাছ ধরার কারণে ইলিশ সংকটাপন্ন হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। এর অংশ হিসেবে ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবছর ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া শুরু হয়। গত বছর থেকে এই সময়সীমা পরিবর্তন করে ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, নদীতে কারেন্ট জাল দিয়ে ছোট ইলিশ ধরা হচ্ছে এবং সাগরে বাণিজ্যিক ট্রলারগুলোও ৪০ মিটারের কম গভীরতায় গিয়ে ছোট ইলিশ ধরছে।

মোল্লা এমদাদুল্যাহ বলেন, ‘নদী থেকে সাগরে যাওয়ার সময় মোহনায় ছোট ইলিশ ধরা হচ্ছে। সাগরেও অতিরিক্ত মাছ ধরা হচ্ছে। ফলে ছোট মাছগুলো রেহাই পাচ্ছে না। নদী ও সাগরের দূষণও উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। নদীর নাব্যতা সংকট ও দূষণের কারণেই ইলিশের উৎপাদন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি চর জেগে ওঠার কারণে মাইগ্রেশন রুট বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রজনন ও নার্সারি গ্রাউন্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ‘

সাগরে বাণিজ্যিক ট্রলারগুলোর মাধ্যমে ছোট ইলিশ অবাধে ধরা পড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সাগরকেন্দ্রিক নতুন প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে । বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে কয়েক বছর সময় লাগবে। তবে সাগরে ট্রলার নিয়ন্ত্রণ করে মজুত বাড়াতে হবে।’

বর্তমানে দেশে ইলিশের পাঁচটি অভয়াশ্রম রয়েছে। এর মধ্যে পদ্মা ও মেঘনা দুটি এবং তেতুলিয়া, গজারিয়া ও কালাবদর নদীতে একটি করে অভয়াশ্রম রয়েছে। তবে কলাপাড়ার আন্ধারমানিক নদীর অভয়াশ্রমটি এখন আর কার্যকর নেই। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারত উপকূলের ইলিশ নিয়ে গবেষণা করছে। ওই প্রকল্পে গবেষক হিসেবে যুক্ত আছেন ড. আনিসুর রহমান।

তিনি বলেন, ‘যেভাবে উৎপাদন ও ওজন কমছে, তা উদ্বেগজনক। কেন এমন হচ্ছে তা গবেষণার মাধ্যমে নিশ্চিত করা দরকার। জাটকা বড় হওয়ার সুযোগ না পেলে বড় ইলিশ পাওয়া সম্ভব নয়। একই ঘটনা পরপর দুই বছর ঘটলে উৎপাদনে বড় ধস নামে। এছাড়া মিঠা পানিতে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ ও পানিপ্রবাহের ঘাটতিও উৎপাদন কমাতে পারে।’

মোল্লা এমদাদুল্যাহ ও ড. আনিসুর রহমান উভয়েই মনে করেন, ইলিশ সংরক্ষণে নদী ও সাগরে নজরদারি আরও জোরদার করা জরুরি। তথ্যসুত্র : বিবিসি বাংলা।