পে স্কেল বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণে কমিটির বৈঠক, সিদ্ধান্ত নিয়ে যা জানা গেল
সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তুতি আরও একধাপ এগিয়েছে। আগামী জুলাই থেকেই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের সিদ্ধান্ত থাকলেও এর বাস্তবায়ন কৌশল এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এ লক্ষ্যে সচিব কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশনের প্রস্তাব এবং সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামোসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় আগামী ২৪ জুন আবারও বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে পুনর্গঠিত সচিব কমিটির এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ, সচিব কমিটির পর্যবেক্ষণ, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশনের প্রস্তাব এবং সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও পর্যালোচনা করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকার সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো তথা নবম পে স্কেল আগামী জুলাই মাস থেকেই কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে কী পদ্ধতিতে এবং কোন ধাপে এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বৈঠকে নবম পে স্কেলের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এ কারণে আগামী ২৪ জুন সচিব কমিটির আরও একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। নতুন বেতন কাঠামো দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ওই বৈঠকের পরও প্রয়োজন হলে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় বেতন কমিশনের মূল সুপারিশ পুরোপুরি কার্যকর না করে তা পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের চিন্তা করছে সরকার।
আরও পড়ুন: কার্যকর ১ জুলাই হলেও পে স্কেলের বেতন পেতে সময় লাগতে পারে আরও তিন মাস
এদিকে নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ধারাবাহিক আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। আগামী ২৪ জুনের বৈঠকে বাস্তবায়ন কৌশলের আরও গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রায় ১১ বছর ধরে একই বেতন কাঠামোর আওতায় বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণের লক্ষ্যে আজ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন পুনর্গঠিত সচিব কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ, সচিব কমিটির পর্যবেক্ষণ, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশনের প্রস্তাবনা এবং সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামোসংক্রান্ত বিষয় পর্যালোচনা করা হবে।
নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে বর্তমানে মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় সরকারি চাকরিজীবীদের দেওয়া বিশেষ সুবিধা আর পৃথকভাবে বহাল থাকবে না। বর্তমানে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা মূল বেতনের ১৫ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তারা ১০ শতাংশ হারে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন। নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর এসব সুবিধা মূল বেতনের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
এ কারণে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডভুক্ত চাকরিজীবীদের কার্যকর বেতন বৃদ্ধি প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন অস্থায়ী সুবিধা ও ভাতার পরিবর্তে মূল বেতন কাঠামোকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে চাকরিজীবীদের পেনশন, গ্র্যাচুইটি এবং অন্যান্য অবসরকালীন সুবিধার পরিমাণও বাড়বে।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ মোট ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এই বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা।
এর মধ্যে কর্মকর্তাদের বেতনের জন্য ১৪ হাজার ৪ কোটি টাকা, কর্মচারীদের বেতনের জন্য ৩০ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন ধরনের ভাতা বাবদ ৪৫ হাজার ১২৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া জনপ্রশাসন খাতে মোট বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, অতিরিক্ত এই অর্থের বড় একটি অংশ থোক বরাদ্দ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। সেখান থেকে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা নবম জাতীয় পে-স্কেলের আংশিক বাস্তবায়নে ব্যয় করা হবে।