সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় কর বাড়ানোর প্রতিক্রিয়ায় যা হবে
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় অগ্রিম কর বাড়িয়েছে সরকার, যার ফলে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ থেকে আগের তুলনায় মানুষের হাতে টাকা আসবে কম। এবারের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে প্রস্তাব করেছেন তাতে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকা তোলার সময় এখন থেকে ১০ শতাংশ হারে অগ্রিম কর কেটে রাখবে সরকার। এর আগে সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় পাঁচ শতাংশ হারে উৎস কর কাটা হতো।
তবে প্রস্তাব অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে অগ্রিম কর কেটে রাখার পর বছর শেষে সেটি কোনো করদাতার প্রদেয় আয়করের চেয়ে বেশি হলে কর হিসেবে বাড়তি নেওয়া টাকা সরকার ফেরত দেবে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, সরকার দেশের প্রতিটি ব্যক্তি ও পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নতির লক্ষ্যে, নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর হ্রাসের একটি বড় জনমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
অথচ মধ্যবিত্তের নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে মুনাফায় কর বাড়ানোর কারণে যারা এই মুনাফার টাকায় ঘর সংসার চালাতে নির্ভর করেন তাদের ওপর চাপ কিছুটা হলেও বাড়বে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে মুনাফা কম পেলে কিংবা লাভের দিক থেকে ব্যাংকে টাকা জমা রাখার পরিবর্তে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ আকর্ষণীয় না হলে মানুষ সঞ্চয়পত্র কিনতে আগ্রহী হবে কি-না সেই প্রশ্নও উঠছে। সাধারণত অবসরপ্রাপ্ত চাকুরীজীবী, প্রবাসী পরিবারের সদস্য কিংবা গৃহিণীরা সঞ্চয়পত্র বেশি কিনেন- এমন ধারণা প্রচলিত আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, ‘যেভাবেই হোক, আয় কমলে মানুষ অস্বস্তিতে পড়ে। আর সঞ্চিত অর্থ ব্যাংকে রাখলে কত লাভ পাবো আর সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলে কত পাব- সেই হিসাব নিশ্চয়ই মানুষ করবে।’
যদিও বেসরকারি সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, ‘ব্যাংক ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা কম। সুদের হারও তুলনামূলক কম। সে জায়গায় সঞ্চয়পত্র এখনো আকর্ষণীয় বিনিয়োগ। ফলে মুনাফায় কর বাড়লেও মানুষ খুব বেশি নিরুৎসাহিত এখনি হবে বলে মনে হয় না।’
বাজেটে কী বলা হয়েছে
বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের চার ধরনের সঞ্চয়পত্র আছে। এগুলো হলো পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। পরিবার সঞ্চয়পত্র ছাড়া বাকি সব সঞ্চয়পত্রে ব্যক্তির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানও বিনিয়োগ করতে পারে। মেয়াদপূর্তি সাপেক্ষে সঞ্চয়পত্রে সুদের হার ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
সরকার তার ঘাটতি মোকাবিলায় সঞ্চয়পত্র থেকে অর্থ ধার করে থাকে। কিন্তু সঞ্চয় অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছর সঞ্চয়পত্র বিক্রির তুলনায় বেশি ভাঙানোর কারণে ঋণ নেওয়ার চেয়ে বেশি পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে। এমন প্রেক্ষাপটে সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় উৎস করের পরিবর্তে এবার অগ্রিম কর কাটার পদ্ধতি চালু করতে ২০২৩ সালের আয়কর আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় পরিবর্তন এনেছে সরকার, যা অর্থমন্ত্রী অর্থবিল ২০২৬-এ প্রস্তাব করেছেন। সংসদে উত্থাপিত অর্থবিলই মূলত বাজেট হিসেবে পরিচিত।
অর্থমন্ত্রী ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের জন্য নয় লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন, যাতে ঘাটতির পরিমাণ প্রায় দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। বাজেট প্রস্তাবনায় প্রতিবছরের মতো এবারেও সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। এবার এর পরিমাণ সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা। মূলত বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার যেসব খাত থেকে ঋণ নিয়ে থাকে সঞ্চয়পত্র তার একটি।
বাজেট প্রস্তাবনা অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা তোলার সময় এখন থেকে ১০ শতাংশ হারে অগ্রিম কর কেটে রাখবে সরকার। এর আগে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর পাঁচ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা হতো। নতুন প্রস্তাবে সেই ব্যবস্থা বাতিল করে উৎসে কর্তিত করকে 'অগ্রিম কর' হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এখন সঞ্চয়পত্রে সাড়ে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতি এক লাখ টাকায় মাসে প্রায় ৯৯৪ টাকা মুনাফা পাওয়া যায়। এতদিন ৫ শতাংশ হারে কর কাটার পর বিনিয়োগকারী ৯৪৫ টাকা গ্রহণ করতে পারতেন। কিন্তু নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী এখন বিনিয়োগকারী পাবেন নয়শ টাকারও কম।
যদিও বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে শুক্রবার অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার দাবি করেছেন যে ‘সঞ্চয়পত্র নিয়ে বাজেটে নতুন কোনো নীতি গ্রহণ করা হয়নি।’
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সঞ্চয়পত্র বিক্রি সম্পর্কিত যে তথ্য চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশ করেছে তাতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে অর্থাৎ জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে সঞ্চয়পত্রের নিট বা প্রকৃত বিক্রির পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৪৬১ কোটি দুই লাখ টাকা।
বিশ্লেষকরা যা বলছেন
বিশ্লেষকরা বলছেন হাতে টাকা থাকলে সাধারণত সেই টাকা সঞ্চয়পত্র বা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ কিংবা ব্যাংকে জমা রাখে মানুষ। কিন্তু ব্যাংক খাত নিয়ে অনাস্থা আর শেয়ারবাজারের দুরবস্থার কারণে অনেকের কাছে সঞ্চয়পত্রই ছিল একমাত্র নিরাপদ বিনিয়োগযোগ্য ক্ষেত্র। ঢাকার রামপুরার অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরে রফিকুল ইসলাম গত ১১ বছর ধরে নিয়মিত সঞ্চয়পত্রে অর্থ বিনিয়োগ করে আসছিলেন।
তার মতে, সঞ্চয়পত্রে যারা বেশি অর্থ বিনিয়োগ করে কিংবা এই বিনিয়োগের অর্থ থেকে যারা সংসার ব্যয় নির্বাহ করে তাদের জন্য কর বাড়ানোর খবরটা দুশ্চিন্তার।
‘আমি নিজেও অনেক বছর ধরে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছি। যদিও আমার সংসারের অর্থ এই আয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। কিন্তু আমি এমন কয়েকজনকে চিনি তাদের সংসার ব্যয়ের বড় অংশই সঞ্চয়পত্রের লাভ থেকে আসা। আমি নিশ্চিত তারা বেশ হতাশ হবেন’, বলছিলেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলছেন, এই হতাশা আসাটা খুবই স্বাভাবিক এবং সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ব্যাংকে রাখা টাকার তুলনায় আকর্ষণীয় না হলে মানুষ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ উৎসাহী হবে না। আগের চেয়ে লাভ কমায় এমনি মানুষ নতুন করে সঞ্চয়পত্র কিনছে কম। এখন মুনাফার ওপর কর আরও বাড়লে মানুষ হিসেবে করবে কোথায় লাভ বেশি সঞ্চয়পত্রে নাকি ব্যাংকে। সেক্ষেত্রে মানুষ টাকার রাখার জন্য ভালো ব্যাংকের দিকে ঝুঁকবে। আমার মতে সঞ্চয়পত্রকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় রাখলে মানুষ বেশি উৎসাহী হবে।’
তার মতে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কর দ্বিগুণ করে সরকার হয়তো এই ইঙ্গিত দিতে চাইছে যে তারা সঞ্চয়পত্রকে আকর্ষণীয় রাখতে চাইছে না বরং তারা চাইছে মানুষ ব্যাংকের দিকে আগ্রহী হয়ে ওঠুক।
তবে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, সরকার অনেকগুলো খাতে কর ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং সে কারণে রাজস্ব আদায়ের উৎস বাড়ানোর একটি চেষ্টা এবারের বাজেটে দেখা যাচ্ছে। রাজস্ব বাড়ানোর জন্য এনবিআর বহির্ভূত উৎস হিসেবেই হয়ত সরকার সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় কর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বছর শেষে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পর অগ্রিম হিসেবে বাড়তি অর্থ রিফান্ড করার সুযোগই এবার রাখা হয়েছে। তাছাড়া ব্যাংকে সুদের হার আরও কম ও ব্যাংক ব্যবস্থায় অনেকের আস্থাও কম। সে কারণেই সঞ্চয়পত্র আমার মনে হয় এখনো বিনিয়োগের আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হিসেবেই থাকবে।’
তার মতে, সরকারের রাজস্ব দরকার এবং সে কারণে যেখানেই সুযোগ আছে সেখানেই চেষ্টা করছে সরকার, ‘সব মিলিয়ে সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় কর বাড়ানো রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টারই প্রতিফলন।’