১১ জুন ২০২৬, ১৬:১৫

যে কারণে বাজেট পেশের জন্য অর্থমন্ত্রীর হাতে থাকে কালো ব্রিফকেস

অর্থমন্ত্রীর হাতে কালো ব্রিফকেস  © সংগৃহীত

জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের জন্য বাজেট উত্থাপনের জন্য রেওয়াজ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী অর্থমন্ত্রীকে পাশে নিয়ে অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন। এ সময় অর্থমন্ত্রীর হাতে থাকে একটি কালো ব্রিফকেস। আর এই কালো রঙের ব্রিফকেস নিয়ে জনমানসে নানা জিজ্ঞাসা কাজ করে। তাদের প্রশ্ন— কী থাকে অর্থমন্ত্রীর ব্রিফ কেসে?

আসলে অর্থমন্ত্রীর ব্রিফকেসে কোনো নগদ অর্থ থাকে না, বরং এতে আগামী নতুন অর্থবছরের জন্য দেশের সম্ভাব্য আয়-ব্যয় পরিকল্পনা, বাজেট বক্তৃতা এবং বিভিন্ন আর্থিক নথিপত্র থাকে। আলোচিত ব্রিফকেসটিতে থাকে অর্থমন্ত্রীর লিখিত মূল বক্তব্য বা বাজেট স্পিচ, আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সরকার কোথা থেকে আয় করবে (যেমন— রাজস্ব, কর ইত্যাদি) এবং কোথায় ব্যয় করবে (যেমন—উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি বেতন-ভাতা ইত্যাদি) তার বিস্তারিত পরিকল্পনা, কর আরোপ বা কমানো সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনাসমূহ।

কেন এই ব্রিফকেস?
বাজেটের তথ্য জাতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। আগাম তথ্য ফাঁস হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট, শেয়ারবাজারে অস্থিতিশীলতা বা পণ্যের দাম বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই বাজেটের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতীকী মাধ্যম হিসেবে ব্রিফকেস ব্যবহার করা হয়।

কালো ব্রিফকেসের মাহাত্ম্য জানতে হলে চলে যেতে হবে বাজেট শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থের দিকে। নর্মানদের কল্যাণে ফরাসি ভাষা ‘বুজেট’ থেকে ইংরেজি ভাষায় বাজেট শব্দটির আগমন। বাজেট শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘টাকার থলি’ কিংবা ‘মানিব্যাগ’।

আঠারো শতকে ইংল্যান্ডের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ছিলেন রবার্ট ওয়ালপুল। ১৭২৫ থেকে ১৭৪২ সাল পর্যন্ত তিনি দেশটির অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তার সময়ে শিল্প বিপ্লবের প্রাক্কালে বিভিন্ন মহল থেকে কর কমানো, বাড়ানো, নানা ধরনের সলাপরামর্শের চিরকুট আসত তার কাছে। তিনি সেসব চিরকুট নিজের মানিব্যাগে রেখে দিতেন। পরবর্তীতে বাজেটের সময়ে এসব চিরকুটের শলাপরামর্শ ও দাবি-দাওয়ার ভিত্তিতে তিনি বাজেট প্রণয়ন করতেন—যেখানে সব মহলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা করা হতো।

এই যে মানিব্যাগে বাজেটের নানা প্রস্তাব লুকিয়ে রাখা— এটিই ছিল কালো ব্রিফকেসের সূতিকাগার বা উৎপত্তি। শিল্পবিপ্লবের পরে যুক্তরাজ্যের বাজেটসহ ইউরোপের বাজেট বড় হতে শুরু করে। তখন আর মানিব্যাগে চিরকুট নিয়ে নয়, বাজেটের নানা প্রস্তাব ও পরামর্শের জন্য দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীদের রীতিমতো ব্রিফকেস কিনতে হয়েছে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত বাজেট প্রণয়নে ব্রিফকেস হয়ে উঠেছে বাজেট সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এ ছাড়াও একটি দেশের বাজেট ওই দেশের গোপনীয় নথির অন্তর্ভুক্ত, বিশেষ করে উত্থাপনের আগ পর্যন্ত। যদি কোনো ব্যবসায়ী কিংবা প্রতিষ্ঠান আগে থেকে জেনে যায় আগামী বাজেটে কী কী পরিবর্তন আসছে— তারা সে সুযোগটি কাজে লাগিয়ে রাতারাতি বড় অঙ্কের মুনাফা কামিয়ে ফেলতে সক্ষম। কাজেই সংসদে বাজেট পেশের আগে বাজেটের বিষয়সমূহ গোপন রাখতে হয়। বলা হয়ে থাকে, যে অর্থমন্ত্রী তার বাজেটের গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারেন না, তার পক্ষে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা সম্ভব না। গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে অর্থমন্ত্রী দ্বারস্থ হোন লকড ব্রিফকেসের। আর এভাবেই ব্রিফকেস হয়ে ওঠে বাজেটের প্রাগৈতিহাসিক সঙ্গী।

বাজেট গোপন রাখতে না পারার কারণে ১৯৪৭ সালে যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী হিউ ডালটনকে পদত্যাগ পর্যন্ত করতে হয়েছিল। বাজেট পেশের আগে সাংবাদিকরা যখন হিউকে বাজেট সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন করেন, তিনি গোপন কিছু তথ্য সাংবাদিকদের কাছে ফাঁস করে দেন। এতে বাজেট উত্থাপনের আগেই সংসদ সদস্য ও সাধারণদের মধ্যে হইচই শুরু হয়ে যায়। শেষমেশ স্থগিত করতে হয় বাজেট উত্থাপন। পদত্যাগ করেন অর্থমন্ত্রী হিউ ডালটন।

একটা সময়, অনেক দেশে বাজেটের আগের সপ্তাহে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মুখ্য কর্মকর্তাদের একটি হোটেল কক্ষে প্রায় বন্দি অবস্থায় রাখা হতো। তাদের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেয়া হতো না। হোটেল কক্ষেই তারা বাজেট গঠন করতেন ও সংসদে উত্থাপনের পরে বাড়ি ফিরতে পারতেন। তবে এখন সময় বদলে গেছে। নানামুখী স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা শেষে বাজেট প্রণয়ন করা হয়। বাজেটে সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করা হয়। বাজেটের আগে দফায় দফায় অনুষ্ঠিত হয় নানামুখী আলোচনা সভা। এরপরে অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টরা আলোচনা শেষে প্রস্তুত করেন পুরো অর্থবছরের বাজেট। আর সেই বাজেট কালো ব্রিফকেসে পুরে অর্থমন্ত্রী প্রবেশ করেন সংসদে, উত্থাপন করেন বাজেট।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) নতুন অর্থবছরের (২০২৬-২০২৭) বাজেট উত্থাপন করছেন। রেওয়াজ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে নতুন অর্থবছরের বাজেট উত্থাপনের জন্য জাতীয় সংসদে প্রবেশ করেন। এ সময় কেতাদূরস্ত অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ডান হাতে দেখা যায় সেই ‘কালো ব্রিফকেস’। এরপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে বেলা তিনটার দিকে অর্থমন্ত্রী নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন শুরু করেন।

এবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তাব করছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়িয়ে পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় মোট বাজেটের ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরে ছিল ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

বাজেটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে এগিয়ে নেওয়া। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের এটি প্রথম বাজেট।

সংসদে বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার বিবেচনায় রেখে বাজেট প্রস্তাব প্রণয়ন করা হয়েছে।

বাজেটের আয়-ব্যয়ের কাঠামো তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে।

তিনি জানান, আগামী অর্থবছরে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। এ ব্যয়ের মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ৩ লাখ কোটি টাকাসহ মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়সহ অন্যান্য খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার ধীরে ধীরে বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সে অনুযায়ী আগামী অর্থবছরে মোট উন্নয়ন ব্যয় চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশে উন্নীত হবে। একই সময়ে পরিচালন ব্যয় ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।