১১ জুন ২০২৬, ১৫:১৩

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট, পরিচালন ব্যয় সাত শতাংশ কমানোর প্রস্তাব

জাতীয় বাজেট  © টিডিসি সম্পাদিত

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়িয়ে পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় মোট বাজেটের ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরে ছিল ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি’র পথে এগিয়ে নেওয়া। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের এটি প্রথম বাজেট।

সংসদে বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার বিবেচনায় রেখে বাজেট প্রস্তাব প্রণয়ন করা হয়েছে।

বাজেটের আয়-ব্যয়ের কাঠামো তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে।

তিনি জানান, আগামী অর্থবছরে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। এ ব্যয়ের মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ৩ লাখ কোটি টাকাসহ মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয়সহ অন্যান্য খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার ধীরে ধীরে বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সে অনুযায়ী আগামী অর্থবছরে মোট উন্নয়ন ব্যয় চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশে উন্নীত হবে। একই সময়ে পরিচালন ব্যয় ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং বিনিয়োগ ও টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সামগ্রিক ব্যয় কাঠামো সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী জানান, সামাজিক অবকাঠামো, ভৌত অবকাঠামো এবং সাধারণ সেবা—এই তিনটি অংশে ব্যয় কাঠামো বিন্যস্ত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে মোট ২ লাখ ৭৯ হাজার ১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ২৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ভৌত অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এছাড়া সাধারণ সেবা খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ।

তিনি বলেন, সামাজিক খাতে সর্বোচ্চ ও বর্ধিত ব্যয় প্রস্তাব সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি এ বরাদ্দে প্রতিফলিত হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটের ঘাটতি ও অর্থায়ন প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

তিনি জানান, অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আগামী অর্থবছরে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ ৬ হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে ব্যাপকহারে ঋণ গ্রহণের ফলে বর্তমানে ঋণ পরিশোধ ও সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর প্রভাব বাজেট ঘাটতির ওপরও পড়েছে। তিনি জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ২ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে জিডিপির ৪ দশমিক ০৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।