১১ জুন ২০২৬, ১৫:২১

দুর্বল ব্যাংক বাঁচাতে ৪০ হাজার কোটি টাকা খরচের পরিকল্পনা সরকারের

জাতীয় বাজেট  © টিডিসি সম্পাদিত

ব্যাংক ও আর্থিক খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠনে চলতি অর্থবছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিল ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহিতা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপনকালে এসব তথ্য তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

এবারের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি’র পথে এগিয়ে নেওয়া। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের এটি প্রথম বাজেট।

সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার বিবেচনায় রেখে বাজেট প্রস্তাব প্রণয়ন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এবং বিনিয়োগ প্রবাহ সচল রাখতে সরকারের মধ্যমেয়াদি কৌশলের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হলো ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে এ খাতের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এ লক্ষ্যে খেলাপি ঋণ হ্রাস, ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিল ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহিতা জোরদার করা হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের জন্য ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করা হবে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পুনঃমূলধনীকরণ এবং ব্যবস্থাপনা সংস্কার কার্যক্রমও গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনঃমূলধনীকরণের জন্য চলতি অর্থবছরে সরকার প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে।

আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার লক্ষ্যে ব্যাংক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের কথা উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক নিয়োগ ও হস্তক্ষেপ বন্ধ করা হয়েছে। ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে পারিবারিক প্রভাবমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন করা হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মূলধন পর্যাপ্ততা এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা হবে। পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরিধি বাড়িয়ে নারী, তরুণ উদ্যোক্তা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হবে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের অর্থনীতির পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে একটি আধুনিক, শক্তিশালী ও টেকসই আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার খাতে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নে সরকার বদ্ধপরিকর।

তিনি জানান, সরকার ঋণনির্ভর বিনিয়োগকে ইক্যুইটিভিত্তিক বিনিয়োগে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমান ঋণভিত্তিক অর্থনীতি থেকে সরে এসে বিনিয়োগ ও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগনির্ভর (এফডিআই) অর্থনীতি গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।

দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অর্থায়নের জন্য বন্ড মার্কেট এবং বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে বলেও জানান তিনি। এর মাধ্যমে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের ওপর চাপ কমানো হবে। করপোরেট বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, গ্রিন বন্ড, সুকুকসহ অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ উপকরণের উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস গড়ে তুলতে করপোরেট বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পৌর বন্ড (মিউনিসিপাল বন্ড) ইস্যুর কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও বাজেট বক্তব্যে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।