১১ জুন ২০২৬, ১১:০২

শিক্ষায় ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিতে নেই আলাদা বরাদ্দ

জাতীয় বাজেট  © টিডিসি সম্পাদিত

দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ জাতীয় বাজেট আজ জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে রেকর্ড ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হলেও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির জন্য কোনো আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়নি। তবে শিক্ষা খাতে সামাজিক সুরক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা সংস্কার এবং নতুন নতুন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যাপক অর্থ বরাদ্দের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে উপস্থাপিত হতে যাওয়া এই প্রস্তাবিত বাজেটে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে এগিয়ে নেওয়ার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে সদ্য জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বকেয়া পাওনা পর্যায়ক্রমে পরিশোধের জন্য ৪৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সামাজিক সুরক্ষা জোরদারে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ বিতরণের উদ্যোগ রাখা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত শিক্ষার্থীদের জন্য ২৫০ কোটি টাকার পৃথক প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া বুলিং প্রতিরোধে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এবং শিক্ষকদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রশিক্ষণের মতো নতুন উদ্যোগও রাখা হয়েছে।

মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ এবং শ্রেণিকক্ষে ধরে রাখতে সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এসইডিপি) কর্মসূচির আওতায় উপবৃত্তির জন্য ২ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। সাধারণ বৃত্তি ও মেধাবৃত্তির জন্য অতিরিক্ত ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও বিতরণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে ২ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা, সরকারি কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষার সম্প্রসারণ প্রকল্পে ৩৮৬ কোটি টাকা এবং মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য ‘লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন (লেইস)’ প্রকল্পে ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ

কারিকুলাম ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা পরিমার্জন এবং শিক্ষা সংস্কারের জন্য পৃথকভাবে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জেলা সদরের বড় সরকারি বালক ও বালিকা বিদ্যালয়কে আধুনিক স্টেম-ফোকাসড মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে উন্নীত করার প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০০ কোটি টাকা।

প্রান্তিক ও তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছে শহরের মানসম্মত শিক্ষকদের পাঠদান পৌঁছে দিতে প্রথমবারের মতো জাতীয় শিক্ষা টিভি চ্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সব বিদ্যালয়ে গ্রিন অ্যান্ড রিনিউঅ্যাবল এনার্জি ও রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্রকল্প চালু এবং বৃহৎ জেলা শহরগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য গণপরিবহনভিত্তিক যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

বুলিং প্রতিরোধে মাধ্যমিক পর্যায়ের ৫১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলকভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং ১ লাখ ১৮ হাজার ৯৮০ শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন, কাউন্সেলিং ও বুলিং প্রতিরোধ বিষয়ে শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

শিক্ষকদের এআই প্রশিক্ষণ এবং জলবায়ুবিষয়ক অনুদানের জন্যও বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সম্পূর্ণ ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধার আওতায় আনা এবং স্মার্ট ক্লাসরুম নির্মাণের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম খাতে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ৫ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ অর্থ দিয়ে একটি ফলদ ও একটি বনজ গাছ রোপণ, জলবায়ুবিষয়ক দেয়ালিকা প্রকাশ এবং বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হবে। জলবায়ুবিষয়ক প্রশিক্ষণের জন্য ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার আওতায় ১১ হাজার শিক্ষক প্রশিক্ষণ পাবেন।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথমবারের মতো শিক্ষানবিশ ভাতা চালুর লক্ষ্যে একটি পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এ কর্মসূচির জন্য ২২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। গত অর্থবছরে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ ছিল ৯৭ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৬১ শতাংশ। এবার তা বেড়ে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকায় উন্নীত হচ্ছে, যা জিডিপির ২ শতাংশের সমান।

এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ২০ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৩৮টি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পোশাক, ব্যাগ ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ বিতরণের জন্য এককালীন ৫০০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত শিক্ষার্থীদের ট্রমা কাটিয়ে পুনরায় শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে ২৫০ কোটি টাকার বিশেষ কর্মসূচিও রাখা হয়েছে।

এছাড়া বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, ভোকেশনাল শিক্ষা এবং আনন্দময় শিক্ষা চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য আগামী অর্থবছরে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ভবিষ্যতে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে মোট ৪ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

যদিও শিক্ষা খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি বা নতুন কোনো আর্থিক সুবিধা প্রদানের জন্য পৃথক কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। ফলে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন।