০৬ মে ২০২৬, ২১:১৫

বৈশ্বিক সংকটে চাপে পোশাক খাত: বাড়ছে খরচ, কমছে আয়

সংগৃহীত   © সংগৃহীত

বৈশ্বিক অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং জ্বালানি সংকটের প্রভাবে কঠিন সময় পার করছে দেশের পোশাক ও টেক্সটাইল খাত। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহ, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং শিপিং জটিলতার কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ।

একই সঙ্গে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় অর্ডারের প্রবাহেও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে একদিকে বাড়তি খরচ, অন্যদিকে ক্রেতাদের দাম কমানোর চাপ— সব মিলিয়ে চাপে পড়েছে শিল্পখাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম।

দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি পোশাক ও টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে এই খাতের বর্তমান বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের ভাবনা।

বাড়তি খরচের পুরো চাপই যাচ্ছে লাভের অংশ থেকে
আহসান কম্পোজিট এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর রেজাউল করিম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ লোডশেডিং ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে এবং প্রোডাক্টিভিটি কমেছে। যদিও কিছু কম্পোজিট ফ্যাক্টরি গ্যাসের মাধ্যমে আংশিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ, তবে বিদ্যুৎনির্ভর অধিকাংশ ফ্যাক্টরিতে উৎপাদন খরচ ১৫–২০% পর্যন্ত বেড়েছে। তিনি জানান, এই বাড়তি খরচ ক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পুরো চাপটাই যাচ্ছে লাভের অংশ থেকে।

এছাড়া এলসি জটিলতা, কন্টেইনার সংকট এবং শিপিং বিলম্বের কারণে আগে যেখানে পণ্য আসতে ৩০ দিন লাগতো, এখন তা ৪০–৫০ দিনে পৌঁছাচ্ছে। এতে লিড টাইম বেড়ে যাচ্ছে এবং অনেক অর্ডার অন্যান্য দেশে চলে যাচ্ছে। বিশ্ববাজারে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই পরিস্থিতিতে শিল্পখাত টিকিয়ে রাখতে শ্রমিকদের বেতনে সরকারি সহায়তা, জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং নীতিগত প্রণোদনা অত্যন্ত জরুরি।

জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে
নোমান টেক্সটাইলস লিমিটেডের জিএম জাহিদুল হক মজুমদার বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কাঁচামাল, বিশেষ করে সুতা ও কেমিক্যালের দাম প্রায় ৩০–৪০% পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা এখনো ঊর্ধ্বমুখী। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। দিনের প্রায় ৮–১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

শিপিং রুট পরিবর্তনের কারণে কাঁচামাল সময়মতো পৌঁছাচ্ছে না, ফলে সাপ্লাই চেইনে বড় ধরনের বিলম্ব তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকটের কারণে ডেলিভারি ভ্যানগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যা সময়মতো পণ্য সরবরাহকে কঠিন করে তুলছে। এদিকে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে অর্ডার কমে যাওয়ায় তৈরি হয়েছে স্থবিরতা। বাড়তি খরচের চাপে লাভের মার্জিন কমে গিয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রদানে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অনেক ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই শিল্পখাত টিকিয়ে রাখতে সরকারকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা ও ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোর মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিদ্যুৎ সমস্যায় উৎপাদন কমার পাশাপাশি গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে
এনজি অ্যাপারেলস লিমিটেডের জিএম মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিয়মিততার কারণে উৎপাদন কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে বলে জানান তিনি। আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ৪২ টন উৎপাদন হতো, এখন তা কমে ৩৭ টনে নেমে এসেছে। প্রতিদিন ৫–৬ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ধারাবাহিক রাখা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ চলে গেলে মেশিন বন্ধ হয়ে যায় এবং পুনরায় চালু করার সময় পণ্যের মানের সমস্যা দেখা দেয়। এতে শুধু উৎপাদনই কমে না, কোয়ালিটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কাঁচামাল সময়মতো না পাওয়ায় উৎপাদন পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। তিনি জানান, সামনে অর্ডার সংকট আরও বাড়তে পারে এবং কিছু অর্ডার অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। তবে উৎপাদন পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রদানে চাপ তৈরি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

ক্রেতারা খরচ বুঝতে চাচ্ছে না, বরং দাম কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছে
ফকির এপারেলস লিমিটেডের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডাইয়িং) সুশান্ত দে বলেন, চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে কাঁচামালের দাম ও আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি গ্যাস ও জ্বালানি ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিছুদিন আগে জ্বালানি সংকটের কারণে পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হলেও বর্তমানে তা কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ক্রেতাদের মনোভাব। ক্রেতারা এই বাড়তি খরচের বাস্তবতা বুঝতে চাচ্ছে না, বরং উল্টো দাম কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। ফলে লাভের মার্জিন যেখানে আগে ৬–৮% ছিল, তা কমে প্রায় ৩%-এ নেমে এসেছে।

শিপিং রুট পরিবর্তনের কারণে লিড টাইম বেড়ে যাওয়ায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না, ফলে অনেক ক্ষেত্রে মূল্য ছাড় দিতে হচ্ছে। শ্রমিকদের ওপর বাড়তি কাজের চাপ পড়ায় পণ্যের গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের অর্থনীতি ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে দেশের পোশাক ও টেক্সটাইল খাত বর্তমানে এক জটিল সময় পার করছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, শিপিং বিলম্ব এবং ক্রেতাদের চাপ— সবকিছু মিলিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তবুও আশা হারাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। তারা মনে করেন, যথাযথ নীতিগত সহায়তা, জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং বাজার বৈচিত্র্যকরণের মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তবে সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট দীর্ঘমেয়াদে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।