বেতনভাতা বৃদ্ধি সঙ্গে সঙ্গে ঘুষসহ অবৈধ লেনদেনও বাড়ে, বোঝা বইতে হয় জনগণকে
সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির উদ্যোগ যৌক্তিক হলেও এর অতিরিক্ত বোঝা বইবার অর্থনৈতিক সক্ষমতা যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একইসঙ্গে, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের পেশাগত উৎকর্ষতা এবং যাদের অর্থে বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়, সেই জনগণের সহজে সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিতে জনপ্রশাসনে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে কার্যকর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়ে সংস্থাটি বলছে, এর অন্যথা হলে নতুন পে-স্কেল ঘুষ দুর্নীতির প্রিমিয়াম বৃদ্ধির অব্যর্থ হাতিয়ারে পরিণত হবে।
আজ রবিবার (২৫ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ইতোমধ্যে আর্থিক সংকটে ভারাক্রান্ত জনগণের ওপর। প্রস্তাব অনুযায়ী যে বিপুল পরিমাণ অর্থের যোগান দরকার, তা অর্জনের কোনো উপায় জগণের জন্য অর্থসংস্থানসহ আনুষঙ্গিক কোনো সুযোগ-সুবিধা সরকার তৈরি করতে পারেনি। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় এই ব্যয়ভার বহনের সক্ষমতা অর্জনের উপযুক্ত পরিবেশেরও সৃষ্টি হয়নি। সর্বোপরি বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব দ্রব্যমূল্যসহ সকল খাতের ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সাধারণ জনগণের জীবন যাপনের যে ব্যয় বাড়বে, সে বিষয়টি সরকার ভেবে দেখেছে কী না? এ ব্যাপারে সরকারের সুনির্দিষ্ট চিন্তাভাবনা যদি থেকেও থাকে, তাহলে সেটাই বা কী? এবং কোন উপায়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা সম্ভব হবে? তা সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে।’
জনগণের করের টাকায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদান করা হলেও, ঘুষ, দুর্নীতি এবং অনিয়মও যেন একটি বড় সংখ্যক কর্মচারীদের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘অতীতে এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই যে, বেতনভাতা বৃদ্ধির ফলে সরকারি খাতে দুর্নীতি কমে, বরং যে হারে বেতনবৃদ্ধি ঘটে তার চেয়ে বেশি হারে ঘুষসহ অবৈধ লেনদেন বাড়ে, যার বোঝা জনগণকে বইতে হয়, এবারও তার ব্যতিক্রম হবে- এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। একদিকে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সেবাপ্রদানের মানসিকতার ঘাটতি, জবাবদিহিহীন আচরণ ও লাগামছাড়া দুর্নীতিতে অভ্যস্ত রাখা, অন্যদিকে সংকীর্ণ স্বার্থে তাদের চাহিদামাফিক বেতন-ভাতা বৃদ্ধির আবদার মেটানো সাধারণ জনগণের প্রতি উপহাসের শামিল।’
অধিকন্তু, জনগণের ওপর অতিরিক্ত প্রয়োজনীয় অর্থের বোঝা না চাপিয়ে যদি বেতনভাতা বৃদ্ধির নির্ভরযোগ্য উপায় সরকার বের করতে পারে, সেক্ষেত্রেও বেতনভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
তিনি বলেন, ‘সরকারি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের সকল পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট আইন-কানুন ও বিধি প্রতিপালন বাধ্যতামূলক করা সাপেক্ষে এবারের বেতনভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব বিবেচনা করলে, জনগণ তা হয়তো পরীক্ষামূলকভাবে হলেও আরও একবারের জন্য মেনে নিতে পারে। যার অন্যতম পূর্বশর্ত হবে, সকল পর্যায়ের সকল কর্মচারীর আয়-ব্যয় ও সম্পদের হিসাব প্রতিবছর হালনাগাদ করা ও তা প্রকাশ করা। অর্থাৎ যারা তাদের আয়-ব্যয়ের ও সম্পদবিবরণী প্রতিবছর হালনাগাদ করাসহ প্রকাশ করবেন, কেবল তাদেরই জন্যই উল্লিখিত শর্তাবলী পূরণ করে নির্ধারিত বেতন-ভাতা বৃদ্ধি প্রযোজ্য হবে, যারা প্রকাশ করবেন না, তাদের জন্য নতুন ‘‘পে-স্কেল’’ কার্যকর হবে না। সরকারকে এ ব্যাপারে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানাই।’