২৪ অক্টোবর ২০২৬, ২০:৩৪

ব্যাকডেট দেখিয়ে নিয়োগ, ‘টাকায়’ এমপিওভুক্তি—তিন শিক্ষকের নিয়োগে জালিয়াতির অভিযোগ

অভিযুক্ত তিন শিক্ষক  © টিডিসি সম্পাদিত

ঝালকাঠি সদর উপজেলার দিবাকরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তিন সহকারী শিক্ষকের নিয়োগ ও এমপিওভুক্তি নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির তিন সহকারী শিক্ষক কাজী ওমর সুলতান, আফরোজা আক্তার ও মনিকা মজুমদারকে নিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী তারিখ (ব্যাকডেট) ব্যবহার করে কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছে। পরে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তাদের এমপিওভুক্ত করা হয়।

নিয়োগ প্রক্রিয়ার বৈধতা যাচাই করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। অভিযুক্তদের মধ্যে মনিকা মজুমদার দিবাকরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক, আফরোজা আক্তার গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী শিক্ষক এবং কাজী ওমর সুলতান সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী শিক্ষক। 

নিয়োগ জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত তিন শিক্ষকই। তাদের দাবি, তারা ২০০২ সালে নিয়োগ পেয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমিক পর্যায় এমপিওভুক্ত হয়েছে ২০২২ সালে। এরপর তারা ২০২৩ সালে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এমপিওভুক্ত হয়েছেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) বলছে, কেবল ডিজির প্রতিনিধি সঠিক না হলেই নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই। সেখানে নিয়োগের সময় জমা দেওয়া সব কাগজপত্র বানিয়ে দেওয়া হলে সেটি ফৌজদারি অপরাধ।

জানতে চাইলে সহকারী শিক্ষক কাজী ওমর সুলতান বলেন, ‘তিনটি জায়গায় সব ধরনের কাগজপত্র দিয়ে এমপিওভুক্ত হয়েছি। জালিয়াতির অভিযোগ মিথ্যা। কোনো একটি গ্রুপ ইচ্ছাকৃতভাবে এমন অভিযোগ করেছে। আমাদের সব ধরনের কাগজপত্র প্রতিষ্ঠানে জমা রয়েছে।’

আপনাদের প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে ২০২২ সালে, তাহলে আপনি ২০২৩ সালে এমপিওভুক্ত কেন হলেন? আপনার সহকর্মীরা আগে কীভাবে এমপিওভুক্ত হলো? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান প্রধানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

অপর দুই অভিযুক্ত মনিকা মজুমদার এবং আফরোজা আক্তার বলেন, ‘এ বিষয়ে আপনাকে কেন তথ্য দেব। আমাদের প্রতিষ্ঠান প্রধান রয়েছে, তার কাছে দেব। আপনি (প্রতিবেদক) যা পারেন করে নেন।’

বিদ্যালয়টির সাবেক প্রধান শিক্ষক তপন কান্তি দাস ও তৎকালীন পরিচালনা কমিটির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসাজশে কাজী ওমর সুলতান, আফরোজা আক্তার ও মনিকা মজুমদারের নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র তৈরি করা হয়। এর মধ্যে মহাপরিচালকের (ডিজি) প্রতিনিধি মনোনয়নসংক্রান্ত অফিস আদেশ, নিয়োগ বোর্ড গঠন এবং নিয়োগ পরীক্ষার নথিপত্রের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব নথি জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে।

জানতে চাইলে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘অভিযোগটি এখনো আমার কাছে এসে পৌছায়নি। তবে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে নিয়োগ পেলে সেটি আইন বহির্ভূত, ফৌজদারি অপরাধ। বিষয়টি খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

প্রতিষ্ঠানটির একাধিক শিক্ষক এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয়টির সাবেক প্রধান শিক্ষক তপন কান্তি দাস ও তৎকালীন পরিচালনা কমিটির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসাজশে কাজী ওমর সুলতান, আফরোজা আক্তার ও মনিকা মজুমদারের নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র তৈরি করা হয়। এর মধ্যে মহাপরিচালকের (ডিজি) প্রতিনিধি মনোনয়নসংক্রান্ত অফিস আদেশ, নিয়োগ বোর্ড গঠন এবং নিয়োগ পরীক্ষার নথিপত্রের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব নথি জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। 

২০২৩ সালের আগে ওই তিন শিক্ষকের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ছিল না। অথচ তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে আগের তারিখ দেখানো হয়েছে। তাদের এমপিওভুক্তির সময় এবং নিয়োগের নথিতে উল্লেখ করা তারিখের মধ্যে অসংগতি রয়েছে। এটি যাচাই করলে বেরিয়ে আসবে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির এক শিক্ষক জানান, তৎকালীন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ কে এম হারুন-অর-রশীদ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) বরিশাল অঞ্চলের প্রোগ্রামার মো. মামুনুর রহমানের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় যাচাই ছাড়াই ওই তিন শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন করা হয়েছে।  

দিবাকরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী একটি প্রতিষ্ঠানের আরেক শিক্ষক জানান, তৎকালীন পরিচালনা কমিটির সভাপতি সাইদুর রহমান সেন্টু (আওয়ামী লীগ নেতা) প্রভাব খাটিয়ে তাদের নিয়োগে সহযোগিতা করেছেন। একইভাবে এমপিওভুক্তিতেও সহযোগিতা করেছেন। সেন্টুর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তখন স্থানীয়ভাবে অনেকে প্রতিবাদ করতে পারেননি। নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় এক সাংবাদিককে মারধরও করা হয়েছিল। 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তৎকালীন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ কে এম হারুন-অর-রশীদ বলেন, ‘ম্যানেজিং কমিটি এমপিওভুক্তির আবেদন ফরোয়ার্ড করেছি। কাগজপত্র চোখের দেখায় সঠিক মনে হওয়ায় আমি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। এখানে টাকা লেনদেনের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।’

প্রতিষ্ঠানটির সব শিক্ষক-কর্মচারী ২০২২ সালে এমপিওভুক্ত হয়েছে, তাদের আবেদন কেন ২০২৩ সালে করা হলো—বিষয়টি আপনি জানার চেষ্টা করেছিলেন কী-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের লোকবল সংকট ছিল। এজন্য তখন সেভাবে সবকিছু যাচাই করতে পারিনি। যেহেতু বিদ্যালয় থেকে পাঠিয়েছে, সেহেতু আমার কাছে সব সঠিকই মনে হয়েছে।’

জানতে চাইলে মাউশির বরিশাল অঞ্চলের প্রোগ্রামার মো. মামুনুর রহমান বলেন, ‘এই তিন শিক্ষককে আমি চিনি। তাদের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তদবির করা হয়। তবে এমপিওভুক্তির জন্য তাদের কাছে কোনো টাকা নেওয়া হয়নি। কেউ যদি এমন অভিযোগ করে, তাহলে তা ভিত্তিহীন। আমার হাতে তেমন কোনো ক্ষমতা নেই। আমি শুধু অনলাইনে আবেদন মাউশির সেন্ট্রালে পাঠিয়ে থাকি।’

আরও খবর: সাত দাবিতে আজ থেকে লাগাতার আন্দোলনে নামছেন শিক্ষা ক্যাডাররা

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দিবাকরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শাহজাহান খান এ নিয়োগ সংক্রান্ত নথিপত্র গ্রহণ করেননি এবং নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে এ বিষয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি মো. শাহজাহান খান।

এদিকে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ব্যাকডেটে নিয়োগ পাওয়া এই তিনজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে অভিযুক্তদের নিয়োগের মূল নথি, বিশেষ করে ডিজির প্রতিনিধি মনোনয়নসংক্রান্ত অফিস আদেশ, নিয়োগ বোর্ডের কার্যবিবরণী, পরীক্ষার ফলাফল, নিয়োগপত্র এবং এমপিওভুক্তির আবেদন ও অনুমোদনের নথি যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা বেরিয়ে আসবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

অভিযোগকারীরা বলছেন, মনিকা মজুমদার, আফরোজা আক্তার গ্রন্থাগার এবং কাজী ওমর সুলতানের নিয়োগসংক্রান্ত নথি ও এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া যথাযথভাবে যাচাই না করা হলে সত্য বের হয়ে আসবে। এ কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছে। তাদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নথিপত্রের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।