বদলি আবেদনে ভাটা, পাঁচ কারণ জানালেন শিক্ষকরা
বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম শুরু হলেও প্রত্যাশিত সাড়া মিলছে না। প্রায় ৬৮ হাজার শূন্য পদ থাকলেও এখন পর্যন্ত ১২ হাজারের কিছু বেশি শিক্ষক বদলির জন্য আবেদন করেছেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার আবেদনের সময়সীমা শেষ হচ্ছে। ফলে শেষ মুহূর্তে আবেদন বাড়লেও বড় একটি অংশ বদলির বাইরেই থাকছেন।
শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বদলি নীতিমালার কয়েকটি শর্ত, শূন্য পদের তথ্যের অসঙ্গতি, কলেজ পর্যায়ে পদ ও বিষয়ের নাম নিয়ে জটিলতা এবং প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষক ছাড়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের নিয়মের কারণে অধিকাংশ শিক্ষক আবেদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
শিক্ষকদের অভিযোগ, কাগজে-কলমে শূন্য পদ থাকলেও বাস্তবে অনেক পদে আবেদন করার সুযোগ নেই। কোথাও কর্মরত শিক্ষক থাকার পরও শূন্য পদ দেখানো হয়েছে, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় শূন্য পদ থাকা সত্ত্বেও বিষয় বা পদের নামের ভিন্নতার কারণে শিক্ষক আবেদন করতে পারছেন না।নারী কোটা ও জ্যেষ্ঠতার কারণে অনেকে আবেদন করছেন না
নারী কোটা ও জ্যেষ্ঠতার কারণে অনেকে আবেদন করছেন না
প্রতিষ্ঠান থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার প্রক্রিয়ার কারণেও অনেকেই আবেদনের আগ্রহ হারিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, নারী ও জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি অগ্রাধিকার হিসেবে থাকায় অনেক শিক্ষক আবেদন করেও শেষ পর্যন্ত বদলির সুযোগ পাবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
একটি প্রতিষ্ঠানে আটজন শিক্ষক বদলির যোগ্য। কিন্তু সেখান থেকে মাত্র দুজন শিক্ষক বদলির সুযোগ পাবেন। ওই আটজনের মধ্যে তিনজন নারী শিক্ষক আবেদন করলে বাকি পাঁচজনের মধ্যে অনেকেই মনে করছেন, তাদের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ আবেদনই করছেন না।
শিক্ষকদের মতে, এ ক্ষেত্রে দূরত্বকে প্রথম অগ্রাধিকার দিলে পরিস্থিতি অনেকটা সহজ হতে পারে। এরপর জ্যেষ্ঠতা এবং স্বামী বা কর্মস্থলের বিষয়টি বিবেচনায় আনা হলে বদলির সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি তুলনামূলক স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে।
কলেজে প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকের আলাদা শূন্য পদে বড় জটিলতা
কলেজ পর্যায়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক পদ আলাদাভাবে দেখানোর কারণে।
শিক্ষকরা বলছেন, ২০১৬ সালের পর বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে কলেজ পর্যায়ে নিয়োগ পাওয়া অনেক শিক্ষক এখনো প্রভাষক পদেই কর্মরত। তাদের সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি হয়নি। ফলে বদলির শূন্য পদে যদি শুধু সহকারী অধ্যাপক লেখা থাকে, তাহলে প্রভাষকরা সেখানে আবেদন করতে পারছেন না।
অথচ ওই শূন্য পদে একই বিষয়ের একজন প্রভাষক কাজ করতে সক্ষম। তাই শিক্ষকদের দাবি, শূন্য পদগুলো প্রভাষক/সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দেখানো হলে উভয় পর্যায়ের শিক্ষকই আবেদন করার সুযোগ পাবেন। এতে বদলির জন্য যোগ্য আবেদনকারীর সংখ্যা বাড়বে এবং শূন্য পদও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
সমস্তর প্রতিষ্ঠানের শর্ত নিয়েও আপত্তি
বদলি নীতিমালায় সমস্তর প্রতিষ্ঠানের বিষয়টিও অনেক শিক্ষককে নিরুৎসাহিত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষকদের মতে, বদলির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে একই স্তর বা পর্যায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কারণে অনেক শিক্ষক কাছাকাছি বা প্রয়োজনীয় শূন্য পদ থাকা সত্ত্বেও আবেদন করতে পারছেন না। তাই নীতিমালা থেকে সমস্তর শর্তটি বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের যুক্তি, শূন্য পদ ও শিক্ষকের যোগ্যতা যাচাই করে বদলির সুযোগ দেওয়া হলে এতে কোনো পক্ষের ক্ষতি হবে না। বরং বেশি শিক্ষক আবেদন করার সুযোগ পাবেন।
ভুল শূন্য পদের কারণে আগ্রহ হারাচ্ছেন শিক্ষকরা
বদলির আবেদনে শূন্য পদের তথ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষকদের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠানে বাস্তবে শিক্ষক কর্মরত থাকার পরও শূন্য পদ দেখানো হয়েছে। আবার কোনো কোনো কলেজে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক থাকার পরও ডিগ্রি স্তরের তৃতীয় শিক্ষককে শূন্য পদ দেখিয়ে চাহিদা দেওয়া হয়েছে।
আবেদন করতে গিয়ে অনেক শিক্ষক বিষয়টি বুঝতে পারছেন। এরপর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানতে পারছেন, ওই পদে আসলে শিক্ষক কর্মরত আছেন।
এতে শুধু একজন আবেদনকারী নয়, একটি জেলার বা বিভাগের সম্ভাব্য অনেক আবেদনকারীই হতাশ হচ্ছেন। কারণ অনলাইনে শূন্য পদ দেখে আবেদন করতে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে তথ্যের মিল না পাওয়ায় তারা অন্য শূন্য পদেও আবেদন করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।
শিক্ষকদের মতে, বদলি কার্যক্রম শুরুর আগে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদের তথ্য মাঠপর্যায়ে যাচাই করা প্রয়োজন ছিল। এখনো ভুল তথ্য সংশোধন করা গেলে শেষ মুহূর্তে অনেক শিক্ষক আবেদন করতে পারেন।
বিষয়ের নাম নিয়ে বিভ্রান্তি
কলেজ পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক শূন্য পদ নিয়েও রয়েছে নানা জটিলতা। একই বা কাছাকাছি বিষয়ের নাম বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভিন্নভাবে ব্যবহার করায় অনেক শিক্ষক কাঙ্ক্ষিত শূন্য পদে আবেদন করতে পারছেন না।
এর মধ্যে রয়েছে- ভূগোল, ভূগোল ও পরিবেশ, যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন, পৌরনীতি ও সুশাসন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি।
শিক্ষকদের মতে, এসব বিষয়ের সমমান বা সংশ্লিষ্টতা স্পষ্ট করে একটি অভিন্ন তালিকা করা হলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান হতে পারে। একই বিষয়ে ভিন্ন নামের কারণে যেন কোনো শিক্ষক আবেদন থেকে বাদ না পড়েন, সে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।