০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৫৮

মানবপাচার চক্র নির্মূলে পাহাড়ে ফের যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান, তিন মরদেহ ঘিরে রহস্য

সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে যৌথ বাহিনী  © টিডিসি ফটো

কক্সবাজারের টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ে গড়ে ওঠা মানবপাচারকারীদের আস্তানা ও বন্দিশালা নির্মূলে আবারও সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে যৌথ বাহিনী। আগের অভিযানে মানবপাচারকারীদের বন্দিশালা থেকে ৫৭ জনকে উদ্ধারের পর এবার পাহাড়ে আরও তিনটি মরদেহ পড়ে থাকার খবর সামনে এসেছে। তবে মরদেহগুলো মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য, নাকি বন্দিদশা থেকে পালানোর চেষ্টা করা কোনো ভুক্তভোগীর—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে রহস্য। মরদেহ উদ্ধারে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

শনিবার (৭ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা-রঙ্গিখালীর দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে অভিযান শুরু হয়। সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের দেড় শতাধিক সদস্য অংশ নিয়েছেন। পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক দল ভাগ হয়ে অভিযান চালাচ্ছে।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) একই এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে মানবপাচারকারীদের একটি বন্দিশালা থেকে ৫৭ জনকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়েছিল। অভিযান চলাকালে পাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে সেনাবাহিনীর সৈনিক মোহাম্মদ তিতাস শেখ (২৭) গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।

এ ঘটনার পর শুক্রবারও (৬ নভেম্বর) পাহাড়ে অপরাধীদের আস্তানা ঘিরে যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত ছিল। অভিযানের সময় হ্নীলা ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ে তিনজনের মরদেহ পড়ে থাকার খবর পায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মরদেহগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

সাঁড়াশি অভিযানে যৌথ বাহিনী

উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগী শহিদুল ইসলাম জানান, দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন। বন্দিশালার কাছাকাছি তিনটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তবে মরদেহগুলো মানবপাচারকারী দলের সদস্য, নাকি বন্দিদশা থেকে পালিয়ে যাওয়া কোনো ভুক্তভোগীর, তা নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, রঙ্গীখালীর পাহাড়ে তিনটি মরদেহ পড়ে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত সেখানে মরদেহ রয়েছে কি না, কিংবা সেগুলোর পরিচয় কী, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি অনুসন্ধানে কাজ করছে পুলিশ।

তিনি আরও জানান, মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকবে।

উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে মানবপাচার চক্রের প্রতারণা, নির্যাতন ও জিম্মি করে রাখার ভয়াবহ চিত্র। আসাদুজ্জামান নামের এক ভুক্তভোগী জানান, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাকে কক্সবাজারে ডেকে আনা হয়। পরে পাহাড়ের একটি গোপন আস্তানায় আটকে রাখা হয়। সেখানে টানা আট দিন বন্দি ছিলেন তিনি। এ সময় দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

তিনি বলেন, ওই বন্দিশালায় ৫০ জনের বেশি মানুষ ছিলেন। তাদের সাগরপথে পাচারের প্রস্তুতি চলছিল। সশস্ত্র ব্যক্তিরা পাহাড়ি আস্তানাটি পাহারা দিতেন। বন্দিদের মুঠোফোনসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।

টেকনাফ পাহাড়ে অভিযানে যৌথ বাহিনী

মানবপাচারকারীদের সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনায় নিহত সেনাসদস্য মোহাম্মদ তিতাস শেখের মরদেহ শুক্রবার সকালে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে রামু সেনানিবাসে নেওয়া হয়। সেখানে আসরের নামাজের পর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে হেলিকপ্টারে তার মরদেহ ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নে গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়। শুক্রবার সন্ধ্যার আগেই মরদেহ সেখানে পৌঁছায়। সামরিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়। নিহত তিতাস লস্করদিয়া ইউনিয়নের আফজাল হোসেনের ছেলে।

পাহাড়ে সেনাসদস্যকে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদ এবং অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে শাস্তির দাবিতে টেকনাফ ও উখিয়ায় মিছিল ও সমাবেশ করেছে বিএনপি। একই দাবিতে মানববন্ধন করেছেন টেকনাফের সাধারণ ছাত্র-জনতা। তারা পাহাড় ঘিরে যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রাখা এবং এলাকাটিকে অপরাধমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম শুক্রবার জানান, পাহাড়ে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরে জানানো হবে।