‘পুলিশের ধাওয়ায় নদীতে ঝাঁপ দেন’ তাহসিফ, ধারণা পিবিআইয়ের
বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তুরাগ নদে ঝাঁপ দিয়েছিলেন বলে ধারণা করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) তাহসিফের বন্ধুস্থানীয় ছোটভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা পরিদর্শনের পর তদন্তকারীরা এমন ধারণা করছেন। এদিকে, দীপ দাবি করেছেন, পুলিশের পোশাক পরা কেউ তাঁদের ধাওয়া দিয়েছিল। তবে কারা এবং কেন তাঁদের ধাওয়া দিয়েছিল, তা যাচাই করছে পিবিআই।
শুক্রবার দুপুরে দীপকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান পিবিআই কর্মকর্তারা। সেখানে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তাঁরা বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন।
পিবিআইয়ের এক পুলিশ সুপার গণমাধ্যমকে বলেন, 'ওরা সেখানে অবস্থান করছিলেন। এ সময় পুলিশের একটি দল তাদের ধাওয়া দিলে দীপ তুরাগ তীরে স্থাপিত বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে গিয়ে লুকান।'
তিনি আরও বলেন, 'আর তাহসিফ নদে গিয়ে ঝাঁপ দেন। এরপর সুযোগ বুঝে দীপ সেখান থেকে চলে আসেন। রাত আড়াইটার দিকে নিজের বাড়িতে ফেরেন দীপ।'
ওই এলাকাটি মাদকস্পট হিসেবে পরিচিত। গভীর রাতে দুজন সেখানে কেন অবস্থান করছিলেন, জানতে চাইলে পিবিআইয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, 'আমরা বিষয়টি জেনেছি, এটা একটু সেনসিটিভ। আরেকটু ক্রসচেক করে নিই।'
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, 'আমরাও শুনেছি, পুলিশের ধাওয়া খেয়ে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন।'
তিনি আরও বলেন, 'পুলিশের কোন টিম তাদের ধাওয়া দিয়েছিল, কেন ধাওয়া দিয়েছিল—আমরা সেগুলো খতিয়ে দেখছি।'
এর আগে শুক্রবার সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের ব্যবহৃত নম্বর প্লেটবিহীন সুজুকি জিক্সার এসএফ মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করে পিবিআই। মোটরসাইকেলটি যেখানে রাখা ছিল, তার খুব কাছেই তুরাগ নদ।
পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ এক বার্তায় জানান, নদ থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে মাজার বস্তি এলাকায় একটি মোটরসাইকেল পাওয়া গেছে। মোটরসাইকেলটি তাহসিফের কি না, তা যাচাই-বাছাই চলছে।
তবে পিবিআই প্রধান মোস্তফা কামাল শুক্রবার সকালে গণমাধ্যমকে বলেন, 'আমরা তাহসিফের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেছি।'
এদিকে, বৃহস্পতিবার রাতে তাহসিফের বন্ধুস্থানীয় ছোটভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর। তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে দীপের ডাকেই বাসা থেকে বের হয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
দীপকে নিয়ে রাতভর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় পিবিআই। শুক্রবার সকালে সংস্থাটির এক পুলিশ সুপার জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীপ তাঁদের বলেছেন, 'আমরা সেখানে (ঘটনাস্থল) কথা বলছিলাম। এ সময় কিছু লোক ধাওয়া করে। তাহসিফ ভাই নদীতে ঝাঁপ দেয়। আর আমি পালিয়ে আসি।'
তবে দুপুরে দীপকে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়ার পর তাঁর বক্তব্যে কিছুটা পরিবর্তন আসে। পিবিআই ঢাকা মেট্রোর (উত্তর) অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, 'দীপ বলছে, তাদের পুলিশের পোশাক পরা কেউ ধাওয়া দিয়েছে। কে ধাওয়া দিল, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।'
তদন্তের অংশ হিসেবে তাহসিফ ও দীপ মাদকাসক্ত ছিলেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে পিবিআই। এ বিষয়ে মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, 'তারা মাদকাসক্ত ছিল কি না, তা ময়নাতদন্তের পর জানা যাবে। দীপ অনেক কিছু বলেছে, আমরা সব কিছু যাচাই-বাছাই করছি।'
উল্লেখ্য, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণকারী হিসেবে আলোচনায় আসা তাহসিফ সাউরির ভাসমান মরদেহ বুধবার বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। স্থানটি উত্তরখান থানার অধীন। অন্যদিকে, তাঁর ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধারের স্থান টঙ্গী পশ্চিম থানার আওতাধীন। তবে দুই এলাকার সঙ্গেই তুরাগ নদের সংযোগ রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, জোয়ারের সময় তুরাগ নদে বেশ স্রোত থাকে। ফলে তাহসিফের মরদেহ উত্তরখানের দিকে ভেসে যাওয়া সম্ভব। এদিকে, মোটরসাইকেলটি তাহসিফ ব্যবহার করলেও সেটির মালিকানা কার নামে, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পিবিআই।