২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৮

ভিডিওটি ছড়িয়েছি, কিন্তু ধারণ করেছি কিনা? হয়তো এ কারণেই আজ আমি বাহিনীতে নেই

অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি  © সংগৃহীত

তুরাগ নদ থেকে মরদেহ উদ্ধার হওয়া বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি মৃত্যুর প্রায় দুই মাস আগে এক পডকাস্টে বলেছিলেন, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের কারণেই তাকে বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে ভিডিওটি ধারণ করার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ কী। একই সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও নাকচ করেছেন তিনি। 

গত ২১ জুলাই ইউটিউবের ‘স্পিক উইথ রশীদ’ (Speak With Rashid) চ্যানেলে প্রকাশিত এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তাহসিফ তার চাকরিচ্যুতি, বিমানবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা এবং গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। সেই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন করে ভাইরাল হচ্ছে। 

ভাইরাল ভিডিওতে তিনি বলেন, প্রথমত, আমার মনে হয়, ‘গণমাধ্যমে’ যে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে, সেটি দিয়ে তারা আসলে কোনো প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য কী, আমি জানি না। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে লেখা হয়েছে, আমি ভিডিওটি ছড়িয়ে দিয়েছি। কিন্তু আমি ভিডিওটি ধারণ করেছি, এমন কথা তারা বলেনি। তারা বলেছে, রিফাত আশরাফি ভিডিওটি ধারণ করেছেন এবং আমি সেটি ছড়িয়ে দিয়েছি। কিন্তু আমি যদি ভিডিওটি ধারণ করেও থাকি বা ছড়িয়েও থাকি, তাহলে এর প্রমাণ কী? আমি সেটি জানতে চাই। এটাও হতে পারে, এ কারণেই হয়তো আজ আমি বিমানবাহিনীতে নেই।

সাক্ষাৎকারে তাহসিফ বলেন, হতে পারে, ওই সময় যেসব ঘটনা ঘটেছিল, সেগুলোর সবকিছু আমি বলব না। আমারও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে আমার মনে হয়, এই অভিযোগের কারণেই তারা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘গণমাধ্যম’-এর প্রতিবেদনটি দেখুন। সেখানে লেখা হয়েছে, আমি ভিডিওটি ভাইরাল করেছি। আবার প্রতিবেদনটির যে টেমপ্লেট তৈরি করা হয়েছে, তার শিরোনাম ছিল ‘বিমানবাহিনীর অভ্যন্তরে র-এর নেটওয়ার্ক ফাঁস’। সেখানে চারজনের ছবি দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে আমার ছবিও রয়েছে। এটি আমার সঙ্গে একেবারেই প্রাসঙ্গিক নয়। ‘র’-এর সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। মানুষ পুরো প্রতিবেদন পড়ে না; অনেকেই শুধু শিরোনাম দেখেই ধারণা করে নেয়। এ কারণে আমাকে সামাজিকভাবে বিব্রত হতে হয়েছে এবং হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। একটি ভুল প্রতিবেদনের কারণে আমাকে এসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, আমি যদি ‘র’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকতাম, তাহলে বাংলাদেশে কেন থাকতাম? আর সংশ্লিষ্ট থাকলে প্রকাশ্যে কথা বলতাম কেন? একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাজ তো এভাবে ঘুরে বেড়ানো নয়। এটি খুবই হাস্যকর একটি অভিযোগ। আইএসপিআরের বিবৃতিটি একটু পড়ে দেখবেন। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আমার এ ধরনের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া বক্তব্যেও বিষয়টি পরিষ্কার।

‘আমার চাকরি ফিরে পাবার জন্য আপিল করিনি। ভবিষ্যতে করব কি না, জানি না। হয়তো কোনো একসময় বিষয়টি ভেবে দেখব। তবে আমার পাসপোর্ট আটকে রাখা হয়েছিল। আমি মনে করি, এটি আমার গণতান্ত্রিক অধিকার। এ বিষয়টি নিয়ে আমি খুবই মনঃক্ষুণ্ন। এর জন্য আমাকে দুই বছর ভুগতে হয়েছে। এখন পাসপোর্ট ফেরত দিয়েছে। আরেকটি বিষয় হলো, একজন পাইলট হিসেবে আমার ফ্লাইং আওয়ারগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। এটি একজন পাইলটের জন্য খুবই সংবেদনশীল বিষয়। কর্তৃপক্ষ চাইলে সেগুলো আমাকে দিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এখনো দেওয়া হয়নি। হয়তো কোনো একদিন দিয়ে দেবে। সেদিন আমি খুব খুশি হব। কারণ, আমি আবার আমার ফ্লাইং ক্যারিয়ার চালিয়ে যেতে পারব।’

‘বিমানবাহিনীর প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ নেই, কোনো অভিযোগও নেই। আমার অভিযোগ সেই মানুষগুলোর বিরুদ্ধে, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে কারও স্বার্থে কাজ করেছেন এবং আমাকে হয়রানি করেছেন। ওই সময় এয়ার ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক যিনি ছিলেন, তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। তিনি আমাকে স্বেচ্ছায় অবসরের একটি আবেদন লিখে তাতে স্বাক্ষর করতে বলেছিলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমি সেটি করলে তিনি আর আমাকে হয়রানি করবেন না। আমি আবেদনটি দেওয়ার পরও বলেছিলাম, আমাকে গ্রেপ্তার করা হোক, আমার কোর্ট মার্শাল করা হোক। কিন্তু এর কোনোটিই করা হয়নি। বরং আমাকে একেক দিন একেক জায়গায় রাখা হয়েছে। আমার সঙ্গে এসব আচরণ অন্যায় ছিল।’

সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি বলেন, তখন গ্রুপ ক্যাপ্টেন আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। তিনি এখন এয়ার কমোডর হয়েছেন। তাকে অভিনন্দন জানাই। আমি স্যারকে খুবই ভালোবাসি। কিন্তু তাদের কিছু কর্মকাণ্ড আমার সঙ্গে অন্যায় ছিল। সত্যকে বদলে দেওয়া, ঘটনার বয়ান পরিবর্তন করা এবং নির্দিষ্ট একজন মানুষকে সামাজিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেওয়া যাতে তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে না পারেন বা সত্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন এসব অন্যায়। আমি অবশ্যই এগুলোকে অন্যায় বলব।

শেষে তিনি বলেন, কেউ আমাকে অনেক ভালো বলবে, আবার কেউ অনেক খারাপ বলবে। তবে আমি সবার সঙ্গে ভালোভাবে মিশতাম। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলাম। মানুষের উপকার করতাম, নিজের স্বার্থের কথা না ভেবেই কাজ করতাম। এ কারণেই অনেকের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল। তবে সম্পর্ক ভালো থাকার অর্থ এই নয় যে, সবাই সব সময় পাশে ছিল। যখন আমার বিরুদ্ধে পরিস্থিতি তৈরি হলো, তখন আমি আসলে সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। এমনকি ওই সময় আমি আমার বাবা-মায়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারিনি।

এদিকে গত ২৭ অক্টোবর রাতে নিখোঁজ হন অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ৯৯৯ এর মাধ্যমে খবর পেয়ে উওরখান থানাধীন রাজাবাড়ী ঘাট সংলগ্ন তুরাগ নদীতে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির কর্মকর্তারা পৌঁছে মরদেহটি উদ্ধার করেন। এ সময় তার পরনে সাদা পাজামা ও কালো জামা। হাতে ঘড়ি ও পকেটে আইফোন পাওয়া যায়। পরে তার সঙ্গে থাকা আইফোনের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তার নাম ফে. লে. (অব) তাহসিফ সৌরি। পিং কে এম এনায়েতুর ঠিকানা- উওরা ১৮ নং সেক্টর করবি ১৪বি।

এ বিষয়ে উত্তরা জোন (দক্ষিণখান) অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) কে, এইচ, এম এরশাদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, গতকাল সন্ধ্যায় নৌ-পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত মরদেহ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। এ ঘটনায় কোন মামলাও হয়নি। বিস্তারিত তথ্য জানবে নৌ-পুলিশ। 

এ বিষয়ে নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন বলেন, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে বিমান বাহিনীর সাবেক ওই কর্মকর্তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।