সামনে সপ্তাহের শুরুতে নবম পে স্কেলের বেতন, বেতন নির্ধারণে উল্টে যাচ্ছে গ্রেড
নবম জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন মূল বেতন নির্ধারণ বা ‘পে ফিক্সেশন’ কার্যক্রম শেষ হয়েছে গত কদিন আগেই। এখন চলছে বেতন পাওয়ার হিসাব-নিকাশ। জানা যায়, নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নির্ধারণ, আগের বেতনের সঙ্গে পার্থক্য এবং বকেয়া পাওনার হিসাব চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। যদিও এখানেও রয়েছে জানা জটিলতা।
নতুন ঘোষিত পে স্কেল অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের অক্টোবরের বেতন পাওয়ার কথা। সূত্রের তথ্য, নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী আগামী ১ নভেম্বর চার মাসের বকেয়াসহ সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন দেবে সরকার। কিন্তু ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৮ লাখ পেনশনভোগীর মধ্যে সবাই বেতন নির্ধারণ করতে পারেননি। সে ক্ষেত্রে তাঁরা পুরোনো বেতনকাঠামো অনুযায়ী বেতন পাবেন। বর্তমানের মতো তাদের বকেয়াও ওই সময়ে দিয়ে দেওয়া হবে।
জানা যায়, গত ১৭ সেপ্টেম্বর নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হয়। এর প্রায় তিন সপ্তাহ পর, ৫ অক্টোবর থেকে বেতন নির্ধারণের কার্যক্রম শুরু হলেও এখনো অনেক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বেতন নির্ধারণ করতে গিয়ে গ্রেডের ধারাবাহিকতা, উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা এবং বাড়িভাড়া ভাতা হিসাবের ক্ষেত্রে অসংগতি ধরা পড়ছে। পাশাপাশি আইবাস++ ব্যবস্থার নানা জটিলতায় কাজের অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে কেউ প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা না পাওয়ার আশঙ্কা করছেন, আবার কেউ কেউ পদোন্নতি পাওয়ার পরও মোট বেতন কমে যাওয়ার পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারেন। প্রজ্ঞাপন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পর্যাপ্ত জানাশোনার অভাব থেকেই এমন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। উদ্ভূত জটিলতা নিরসনে কাজ চলছে।
এদিকে নতুন কাঠামোর সুবিধা পর্যায়ক্রমে কার্যকর হলেও দুই গ্রেডের বেতনের ব্যবধান থেকেই যাবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রথম পর্যায়ে ৫০ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন দাঁড়াবে ৩১ হাজার ২৩০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩১ হাজার ৫৯০ টাকা। অর্থাৎ ১২তম গ্রেডের কর্মচারী ৩৬০ টাকা বেশি পাবেন।
একইভাবে ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৭৫ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন হবে ৩৫ হাজার ১৫ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩৫ হাজার ৫৯৫ টাকা। তখন ব্যবধান হবে ৫৮০ টাকা। আর ১ জুলাই ২০২৭ থেকে শতভাগ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের বেতন হবে ৪০ হাজার ৮০০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৪১ হাজার ৬০০ টাকা। তখন ব্যবধান বেড়ে দাঁড়াবে ৮০০ টাকা।
নতুন প্রজ্ঞাপনের অনুচ্ছেদ ৫ ও ৯ অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বেতন নির্ধারণ করে নতুন নির্ধারিত বেতন ও বর্তমান বেতনের পার্থক্যের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে ৫০, ৭৫ ও ১০০ শতাংশ সুবিধা কার্যকরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কর্মচারীদের অভিযোগ, এই পদ্ধতিতে বেতন নির্ধারণের সময়ই গ্রেডভিত্তিক বেতনের স্বাভাবিক ক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
৯ম পে স্কেল হিসেবে, শুরুতে ১১তম গ্রেডের বেসিক ২৫ হাজার টাকা; অন্যদিকে ১২তম গ্রেডের বেসিক ২৪ হাজার ৩০০। অর্থাৎ শুরুর বেতনে ১১তম গ্রেডের কর্মচারীরা ১২তম গ্রেডের তুলনায় ৭০০ টাকা এগিয়ে। তবে নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণের সময় দেখা যাচ্ছে, এই ব্যবধান উল্টো হয়ে যাচ্ছে।
তথ্যমতে, ১১তম গ্রেডের এক কর্মচারীর ২০১৫ সালের শুরু বেসিক বেতন ছিল ১২ হাজার ৫০০। গত ৩০ জুন তাঁর মূল বেতন বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৬৬০ টাকা। অর্থাৎ আগের বেতনকাঠামোয় তাঁর মূল বেতন বেড়েছিল ১১ হাজার ১৬০ টাকা। নতুন কাঠামোর বেসিক ২৫ হাজার টাকার সঙ্গে এই বৃদ্ধির পরিমাণ যোগ করলে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ১৬০ টাকা। কিন্তু নতুন কাঠামোয় এই অঙ্কের কোনো ধাপ না থাকায় পরবর্তী ধাপ অনুযায়ী তাঁর মূল বেতন নির্ধারণ করা হচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, ১২তম গ্রেডের এক কর্মচারীর ২০১৫ সালের শুরুর বেসিক বেতন ছিল ১১ হাজার ৩০০ টাকা। গত ৩০ জুন তাঁর মূল বেতন দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৫৮০ টাকা। আগের কাঠামোয় বেসিক বেড়েছিল ১২ হাজার ২৮০ টাকা। নতুন কাঠামোর বেসিক ২৪ হাজার ৩০০ টাকার সঙ্গে এই বৃদ্ধির পরিমাণ যোগ করলে হয় ৩৬ হাজার ৫৮০ টাকা। ফলে পরবর্তী ধাপ অনুযায়ী তাঁর নতুন বেসিক নির্ধারণ করা হচ্ছে ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা।
এ হিসাবে নতুন কাঠামোয় ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন হচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা, আর ১২তম গ্রেডের কর্মচারীর ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ প্রারম্ভিক বেতনে ৭০০ টাকা এগিয়ে থাকা ১১তম গ্রেডের কর্মচারী বেতন নির্ধারণের পর একই পরিমাণে পিছিয়ে পড়ছেন। এতে গ্রেডের স্বাভাবিক ক্রম বজায় থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তথ্যমতে, গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নবম জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে ১৯ সেপ্টেম্বর অর্থ বিভাগ থেকে ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ ২০২৬’ প্রকাশ করা হয়। এতে নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
গত ১৯ অক্টোবর অর্থ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রচলিত যেসব ভাতা মূল বেতনের শতাংশের ভিত্তিতে দেওয়া হয়, সেগুলো ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রাপ্ত মূল বেতনের ভিত্তিতে নির্ধারণ ও প্রদান করতে হবে। সেই ধারাবাহিকতা ধরেই চূড়ান্তভাবে পে স্কেলের সুবিধা পেতে যাচ্ছেন সরকারি চাকরিজীবীরা।