খুলনায় একের পর এক খুন-গুলি, আতঙ্কে সাধারণ মানুষ
খুলনা মহানগরীতে একের পর এক খুন, গুলিবর্ষণ, চাঁদাবাজি ও ভাঙচুরের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। চলতি অক্টোবর মাসেই নগরীতে অন্তত পাঁচটি হত্যাকাণ্ড ও ১০টি স্থানে গুলির ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। মাদক কারবার, গ্যাং কালচার ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব সহিংসতা ঘটছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। অপরাধীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ ও নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।
গত ২২ অক্টোবর ছিল খুলনার জন্য একটি অত্যন্ত ভয়ংকর ও রক্তাক্ত দিন। মাত্র ১৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দুজনকে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। ওই দিন ভোরে সদর থানার পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় তৌহিদুল ইসলাম তুষার (৩২) নামের এক যুবককে প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। নিহতের লাশ রাস্তায় পড়ে ছিল। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করলেও নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে।
একই দিন সন্ধ্যার পর লবণচরা থানার জিন্নাহপাড়া বৌবাজার এলাকায় মায়ের সামনে খুশি বেগম (২৪) নামের এক গৃহবধূকে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা গুলি ও কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। একের পর এক এমন চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে পুরো খুলনায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছে।
খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) অপরাধ শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসেই খুলনা মহানগরীতে অন্তত ৩৮টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি ঘটনায় অস্ত্র ব্যবহার করে গুলি করে জখম বা হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতিতে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
জামিনে বেরিয়ে আবারও বেপরোয়া অপরাধীরা
খুলনায় অপরাধের লাগাম টেনে ধরতে না পারার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে অপরাধীদের সহজে জামিন পাওয়া। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে তালিকাভুক্ত অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হলেও তারা খুব দ্রুত জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসছে। জামিনে মুক্ত হয়েই তারা আগের চেয়ে আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে এবং নতুন করে অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলছে।
ব্যবসায়ীরাও নিরাপদ নন
গত শনিবার খুলনায় মাত্র ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি পৃথক স্থানে গুলি ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে একজন ব্যবসায়ী এবং একজন যুবদল নেতা গুলিবিদ্ধ হন। এ সময় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে গুলি ছোড়ার পাশাপাশি ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়, যা প্রমাণ করে যে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বরং ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীরাও সন্ত্রাসীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন।
কেএমপির উপকমিশনার রেজাওয়ান রহমান এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, গ্রেপ্তার সন্ত্রাসীরা দ্রুত জামিন পাওয়ায় আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারাও বলছেন, মূল অপরাধীরা ধরা না পড়ায় এবং জামিনে বেরিয়ে আসায় সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কে রয়েছে। অনেক সময় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ভুক্তভোগী পরিবার বা স্বজনরা মামলা করতেও ভয় পান। মামলার অভাবে এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তাহীনতার কারণে অপরাধের সঠিক তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
খুলনার সচেতন নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষ অবিলম্বে এই অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেছেন। তাদের মতে, সন্ত্রাসীদের জামিন পাওয়ার আইনি পথ বন্ধ করা, যৌথ অভিযান আরও জোরদার করা এবং মূল অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও বেশি নাজুক হয়ে পড়তে পারে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও প্রশাসনের দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা এখন সময়ের দাবি।