২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৩

কাল ইসরায়েলের নির্বাচন, ক্ষমতা হারানোর মুখে নেতানিয়াহু?

ইসরায়েলে নির্বাচন কাল  © সংগৃহীত

ইসরায়েলের জাতীয় সংসদ নেসেটের নির্বাচন আগামীকাল মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর)। সর্বশেষ জনমত জরিপে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ১২০ আসনের সংসদে প্রায় ৫০টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, তার বিরোধী শিবির পেতে পারে ৫২টি আসন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। ফলে কোনো পক্ষই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে আরব দলগুলোর সমর্থনই নির্ধারণ করে দিতে পারে, কারা ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠন করবে। খবর আলজাজিরা ও রয়টার্সের।

নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট। তার নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পার্টি সাম্প্রতিক কয়েকটি জরিপে এগিয়ে রয়েছে। তবে কোনো দল বেশি আসন পেলেই যে সরকার গঠন করতে পারবে, এমন নয়। ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন।

আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী জোট ৫০টি এবং ইহুদিপ্রধান বিরোধী জোট ৫২টি আসন পেতে পারে। ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন পেতে পারে। ফলে নির্বাচনের পর জোট গঠনের আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এবারের নির্বাচন
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এটিই ইসরায়েলের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ওই হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর সাবেক সমর্থকদের একটি অংশও এবার বিরোধী প্রার্থী আইজেনকোটের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, ২০২৩ সালের হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার দায় নেতানিয়াহু এড়াতে পারেন না। তবে তার সমর্থকেরা নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

নেতানিয়াহু ইসরায়েলের দীর্ঘতম সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রীদের একজন। দুর্নীতির মামলায় দেশটির আদালতে তার বিচার চলছে। এ ছাড়া গাজা যুদ্ধের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। তিনি এসব অভিযোগের মুখে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছেন।

৬১ আসনে সরকার গঠন
ইসরায়েলের সংসদ নেসেটের মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য কোনো দল বা জোটকে অন্তত ৬১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন নিশ্চিত করতে হয়। দেশটির আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় ভোটাররা প্রার্থী নয়, মূলত দলীয় তালিকায় ভোট দেন।

রয়টার্স প্রকাশিত ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোনো দলকে সংসদে আসন পেতে জাতীয় পর্যায়ে অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়। এই সীমার নিচে থাকা দলগুলো কোনো আসন পায় না। ফলে ছোট দলগুলোর ভোটের হারও বড় জোটগুলোর আসনসংখ্যায় প্রভাব ফেলতে পারে।

নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির সঙ্গে অতি-ডানপন্থী ও অতি-রক্ষণশীল দলগুলোর জোট রয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরে আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন জোট, ইয়ার লাপিদের দল এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল রয়েছে। নির্বাচনের পর এসব দলের মধ্যে সমঝোতা সরকার গঠনের ফল নির্ধারণ করতে পারে।

ফিলিস্তিনি নাগরিকদের দলগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি আরব নাগরিক। তাদের প্রতিনিধিত্বকারী রাম ও জয়েন্ট লিস্টের মতো দলগুলো নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক জরিপে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৩টি আসন পেতে পারে। অন্য জরিপে তাদের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা আরও বেশি দেখানো হয়েছে।

২০২১ সালে রামের সমর্থন নিয়ে নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছিল। ইসরায়েলের ইতিহাসে আরব দলের সরকারে অংশ নেওয়ার ওই ঘটনা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এবারও নেতানিয়াহুবিরোধী জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে পিছিয়ে থাকলে আরব দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে।

রামের নেতা মানসুর আব্বাস অতীতে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধীদের সহায়তার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তবে নির্বাচনের পর দলগুলো ঠিক কী অবস্থান নেবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

আইজেনকোট এগিয়ে থাকলেও চ্যালেঞ্জ
সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকোট নিজেকে নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছেন। তার প্রচারে নিরাপত্তাব্যবস্থার সংস্কার, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তবে তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিভিন্ন মতাদর্শের বিরোধী দলগুলোকে একসঙ্গে রাখা। কোনো জোট ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে না পারলে সরকার গঠন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ছোট দলগুলো নিজেদের দাবি আদায়ের সুযোগ পাবে।

অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও নতুন অংশীদার সংগ্রহ করে সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারে। ফলে বিরোধী দল বেশি আসন পেলেই নেতানিয়াহুর ক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

ভোটের পর কী?
মঙ্গলবার ভোটগ্রহণ শেষে গণনা শুরু হবে। প্রাথমিক ফল বুধবার (২৮ অক্টোবর) জানা যেতে পারে। আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের সময়সীমা ৪ নভেম্বর পর্যন্ত। এরপর সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হবে। ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট সংসদে সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় একজন নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে নতুন করে রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে শুধু কে বেশি ভোট পেলেন, তা নয়; বরং কে ৬১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন নিশ্চিত করতে পারবেন, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।