২২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৫

ফোন দিলেই ইয়াবার ‘হোম ডেলিভারি’, মাদকের ভয়াল ফাঁদে স্কুলশিক্ষার্থীরাও

প্রতীকী ছবি  © টিডিসি এআই সম্পাদিত

ফোনে যোগাযোগ করলেই মোটরসাইকেলে করে নির্দিষ্ট স্থানে, এমনকি বাসার দরজায়ও পৌঁছে যাচ্ছে ইয়াবা—এমন অভিযোগ উঠেছে জামালপুরে। শহরের অলিগলি থেকে আশপাশের গ্রাম ও চরাঞ্চল পর্যন্ত মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সহজলভ্য এই মাদকের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে কিশোর-তরুণেরাও। বন্ধুদের প্ররোচনা, কৌতূহল কিংবা হতাশা থেকে শুরু হওয়া নেশা একসময় কেড়ে নিচ্ছে তাদের স্বাভাবিক জীবন। এমনকি স্কুলের শিক্ষার্থীদেরও ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়ার ঘটনা সামনে আসছে। মাদকের এই বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবক, স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল।

জামালপুরের একটি পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর কথাই ধরা যাক। বয়স কম, সামনে পড়াশোনা করে সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন। অথচ বন্ধুর প্ররোচনায় ইয়াবা সেবন শুরু করে সে। প্রথমে বিনা মূল্যে, পরে ধীরে ধীরে নিয়মিত সেবনের অভ্যাস। এখন প্রতিদিনের নেশার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলেও সহজে পারছে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই শিক্ষার্থী কথা বলে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে। নিজের হতাশার কথা জানিয়ে ওই শিক্ষার্থী বলে, প্রেমঘটিত হতাশার সময় এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে ইয়াবার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। প্রথমে তাকে বলা হয়েছিল, ইয়াবা সেবন করলে মন ভালো থাকবে, পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়বে। এভাবে কয়েক দিন বিনা মূল্যে ইয়াবা সেবনের পর ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে পড়ে সে। শুরুতে বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু দুই-তিন দিনের মধ্যেই বুঝতে পারি, পরিস্থিতি আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এরপর প্রতিদিন এক থেকে দুটি ইয়াবা সেবন করতে শুরু করি। প্রতিটি বড়ি কিনতে খরচ হয় ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা। কখনো কখনো দিনে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয় নেশার পেছনে।

ওই শিক্ষার্থীর দাবি, পরিচিত কারও মাধ্যমে ফোন বা মুঠোবার্তায় যোগাযোগ করলে মোটরসাইকেলে করে নির্দিষ্ট জায়গায় কিংবা বাসায় ইয়াবা পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে এভাবে মাদক পেতে হলে বিক্রেতার সঙ্গে পরিচিত কেউ থাকতে হয়। এখন নেশা ছাড়তে চাইলেও অভ্যাসের কারণে বারবার একই পথে ফিরে যেতে হচ্ছে তাকে। তবু এই জীবন থেকে বেরিয়ে এসে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে বলে জানায় ওই শিক্ষার্থী।

ডিবির অভিযানে বিপুল মাদকসহ চক্রের এক সদস্য গ্রেপ্তার

স্থানীয়দের অভিযোগ, জামালপুর শহরের বিভিন্ন অলিগলি ছাড়াও আশপাশের গ্রাম ও চরাঞ্চলে ইয়াবার বিস্তার ঘটছে। মাদক কারবারিরা নানা কৌশলে ক্রেতাদের কাছে মাদক পৌঁছে দিচ্ছে। কোথাও নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে মাদক সংগ্রহ করতে হচ্ছে, আবার কোথাও মুঠোফোনে যোগাযোগের পর সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, জেলার মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ ও সরিষাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক কেনাবেচা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে বিকাশ ও নগদের মতো মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে টাকা লেনদেন করা হয়। তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনার সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদকের সহজলভ্যতা তরুণদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে কৈশোরে হতাশা, কৌতূহল, বন্ধুদের চাপ কিংবা পারিবারিক ও সামাজিক সংকটের সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। একবার আসক্ত হয়ে গেলে পড়াশোনা, পারিবারিক সম্পর্ক ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সময়মতো প্রতিরোধ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা না হলে এই আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসাও কঠিন হয়ে ওঠে।

মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চললেও জেলায় মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জামালপুর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত এক বছরে জেলায় ৯৩৪টি অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে ৫ হাজার ৩৬৬টি ইয়াবা বড়ি, ১২ গ্রাম ইয়াবার গুঁড়া এবং ১ হাজার ২০৫টি ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত জেলায় মাদকসংক্রান্ত ১ হাজার ৪১৮টি মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ২ হাজার ১৮৪ জন। এ সময়ে ৫৯ হাজার ১০৯টি ইয়াবা বড়ি, ৩১২ কেজি ৬৮৬ গ্রাম গাঁজা, ৯৮৯ গ্রাম হেরোইন, ১ হাজার ৪৮০ বোতল ফেনসিডিল এবং ৫ হাজার ৪৭৯টি ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা মাদকের আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি ৪২ লাখ ৭২ হাজার ৪৬০ টাকা।

পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জেলায় ৪২ হাজার ৮৫৪টি ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করা হয়েছিল। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ১৬ হাজার ২৫৫টি ইয়াবা বড়ি।

বড় চালান উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে জেলায়। ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর জামালপুর সদর এলাকায় একটি পর্যটকবাহী বাসে তল্লাশি চালিয়ে ২২ হাজার পিস ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার করা ইয়াবার আনুমানিক মূল্য ছিল ৬৬ লাখ টাকা।

২২ হাজার পিস ইয়াবাসহ দম্পত্তি গ্রেপ্তার

মাদকের বিস্তার শুধু আসক্তি ও পারিবারিক দুর্ভোগেই সীমাবদ্ধ নেই; মাদককে কেন্দ্র করে সংঘাত ও অপরাধের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর মেলান্দহ উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়নের চর-২ এলাকায় মাদক মামলার পরোয়ানাভুক্ত আসামি এনামুল হককে (৩০) গ্রেপ্তার করতে গেলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে চার পুলিশ সদস্য আহত হন। এ ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

এর আগেও জেলায় মাদককে কেন্দ্র করে সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে, যা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২২ সালের ২১ মে রশিদপুর এলাকায় মাদকের টাকার জন্য আবদুর রশিদ (৬৫) নামের এক ব্যক্তিকে তার ছেলে রিপন মিয়া হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। একই বছরের ৮ জুন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুবেল হত্যার ঘটনায় রিয়াদ (১৬) নামের এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মাদকের ৬৫ টাকা নিয়ে বিরোধ ছিল হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ।

মাদকের সহজলভ্যতা ও তরুণদের আসক্ত হয়ে পড়ার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। তাদের আশঙ্কা, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. নাজির হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সন্ধ্যার পর বিভিন্ন গলি ও নির্দিষ্ট স্থানে তরুণদের জটলা দেখা যায়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাদক সেবন ও কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। চোখের সামনে একটা পুরো প্রজন্ম শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।

জামালপুর জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীর সেলিম মনে করেন, মাদক শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক সংকট। মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো, পরিবার ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা এবং আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

ডিবির অভিযানে চক্রেরে ৩ সদস্য গ্রেপ্তার

সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ হারুনুর রশিদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি অনীহা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং সহজে মাদক পাওয়ার সুযোগ তরুণদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পড়াশোনায় আগ্রহ বাড়ানো এবং পরিবার থেকে নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের অবসর সময় খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

এ বিষয়ে জামালপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, তরুণ প্রজন্মসহ সবাইকে মাদক থেকে দূরে রাখা তাদের অন্যতম লক্ষ্য। এ জন্য নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে। পাশাপাশি মাদকের বিস্তার রোধে পরিবারকেও সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে। সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধুদের বিষয়ে খোঁজখবর রাখার পাশাপাশি তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা মাদকের ঝুঁকি থেকে দূরে থাকতে পারে।

একই বিষয়ে জামালপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ইয়াহিয়া আল মামুন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অধিকাংশ মাদক সীমান্তপথে দেশে প্রবেশ করে। সীমান্ত এলাকায় পুলিশের সরাসরি কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ সীমিত থাকায় মাদক প্রবেশ ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে। সীমান্তে মাদক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এর সরবরাহ কমানো সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, মাদক কারবারিদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে এবং তরুণদের খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখতে হবে।