‘জায়গা না পেয়ে গেটে বসেছিলাম, দুর্ঘটনার পর বালির মধ্যে পা আটকা লোহায়, আমার ওপর আরও ৩ জন’
নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হন শতাধিক যাত্রী। বাসে জায়গা না পেয়ে গেটে বসেছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের যুবক তামিম। দুর্ঘটনার পর বালির মধ্যে পড়ে যান তিনি। তার ওপর পড়ে ছিলেন আরও তিনজন। লোহার সঙ্গে আটকে যায় তার পা। প্রাণে বেঁচে ফিরলেও সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে শিউরে উঠছেন তিনি।
আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে উপজেলার সরদারপাড়া এলাকায় বরগুনা থেকে রাজশাহীগামী আরপি পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে পাবনাগামী বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে ৯ জন এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন তামিম বলেন, ‘বাসে শতাধিক যাত্রী ছিল। জায়গা না পেয়ে বাসের গেটে বসেছিলাম। দুর্ঘটনার পর বালির মধ্যে পড়েছিলাম। আমার ওপর আরও তিনজন ছিল। আল্লাহ বাঁচাইছে। কী যে ভয়ংকর অবস্থা ছিল, তা ভাষায় বর্ণনা করার মতো না। লোহার সাথে পা আটকে ছিল। ওঠার মতো অবস্থা ছিল না।’
মাদারীপুর থেকে বাসে উঠেছিলেন জানিয়ে তামিম বলেন, তার সঙ্গে শুধু মাদারীপুর থেকেই অন্তত ৫০ জন যাত্রী বাসে উঠেছিলেন। বাসের সব আসনে যাত্রী বসা ছিল। গেট থেকে পেছন পর্যন্ত ঠাসাঠাসি করে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
আহত যাত্রীদের অনেকের ভাষ্য, বাসটিতে শতাধিক যাত্রী ছিলেন। তাদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার সময় চালকের পরিবর্তে বাসটি চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার।
বাসটির যাত্রী ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের জুয়েল কিবরিয়া জানান, তিনি জনতা ব্যাংকে কর্মরত। দুর্ঘটনার পর বাসের হেলপারের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। হেলপার তাকে জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার সময় চালকের বদলে সুপারভাইজার বাসটি চালাচ্ছিলেন।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা থেকে ছেড়ে আসা রাজশাহীগামী আরপি পরিবহনের বাসটির সঙ্গে পাবনাগামী বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধারকাজ শুরু করেন। ঘটনাস্থল থেকে নয়জনের মরদেহ উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
বনপাড়া হাইওয়ে থানার সহকারী পরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন জানান, এ দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে আটজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কাজীরহাট গ্রামের ইউনুস আলীর ছেলে সোহাগ হোসেন (৩০), বড়কান্দি গ্রামের জহুর উদ্দিনের ছেলে জুয়েল রানা (৪০), ডুবিসাহেবের গ্রামের জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে সালাম (৪৫), কাজীরহাট গ্রামের শাহিন হোসেন (২৫), আব্দুস সামাদ ফকির, রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরহাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে বাসচালক সোহেল রানা (৪০), বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আনোয়ার হক (৩০) এবং পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী গ্রামের তাসফিয়া খাতুন (৮)।
নাটোর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুর রউফ জানান, আহতদের উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতাল, স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিক ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের মধ্যে রয়েছেন নওগাঁর আব্দুর নূর ও চিরঞ্জিত, রাজশাহীর শহিদুল ইসলাম, সিয়াম, মজনু ও ফজলু হক, ঝিনাইদহের ডা. এস এম মুশফিকুর রহমান, তাওহীদ ও জুয়েল কিবরিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জের তামিম, ববি, শামীম ও ডালিম, মাদারীপুরের ইমা ও নার্গিস এবং নাটোরের নেহাল ও জুলফিকার।
হাসপাতালের চিকিৎসক ও মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ জানান, আহতদের মধ্যে অন্তত চারজনের অবস্থা গুরুতর। অন্যদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।