১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩২

ভোরে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান এনবিআর কর্মচারী, এআই দিয়ে স্পষ্ট করে প্রার্থীদের কাছে বিক্রি

বাঁ থেকে অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ ও কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর  © সংগৃহীত

ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদের মুঠোফোনে আসে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের একটি অস্পষ্ট ছবি। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে একই প্রশ্নপত্রের আরও স্পষ্ট ছবি পাঠান এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় প্রশ্নপত্রের উত্তর তৈরি করা হয়। উত্তরগুলো হাতে লিখে চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়। তাঁদের মাধ্যমে প্রশ্ন ও উত্তর পৌঁছে যায় সম্ভাব্য পরীক্ষার্থীদের কাছে। এভাবে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ও উত্তরপত্র পরিচিত চাকরিপ্রার্থীদের কাছে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে বলে দাবি করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পাঁচ সরকারি কর্মচারীসহ চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে এসআরবি। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম ও জাহাঙ্গীর, অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর রুবেল ইসলাম এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম রয়েছেন। অন্য দুজন হলেন চক্রের সদস্য হাসিনুর রহমান সুজন ও চাকরিপ্রার্থী মফিজুল ইসলাম।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন। তিনি বলেন, চক্রের সদস্যরা হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। প্রশ্নপত্র সংগ্রহ, উত্তর তৈরি এবং বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সদস্যদের আলাদা ভূমিকা ছিল। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এসআরবির দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুঠোফোনের বার্তা আদান-প্রদানের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। গত ১০ অক্টোবর সকাল ১১টায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের বাছাই পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। ওই দিন ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ প্রশ্নপত্রের একটি অস্পষ্ট ছবি পান। পরে সেটি এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীরকে পাঠানো হয়।

সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর একই প্রশ্নপত্রের আরও স্পষ্ট একটি ছবি নূর মোহাম্মদকে পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে প্রশ্নের উত্তর তৈরি করেন। পরে উত্তরগুলো হাতে লিখে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুলের কাছে পাঠান। সেখান থেকে চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে উত্তরপত্র ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তাঁদের মাধ্যমে তা সম্ভাব্য পরীক্ষার্থী ও প্রশ্নপত্রের গ্রাহকদের কাছে পৌঁছায়। বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র বিতরণের সময় বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পরে কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিত করে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের উৎস সম্পর্কে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক ফায়েজুল আরেফীন বলেন, “প্রাথমিকভাবে নূর মোহাম্মদ জানিয়েছিলেন, তিনি ফেসবুকের মাধ্যমে প্রশ্নটি পেয়েছেন। পরে প্রশ্নটি জাহাঙ্গীরকে দেন। তবে তাঁর দেওয়া তথ্য সঠিক বলে মনে হয়নি। তদন্ত চলছে।”

তিনি আরও বলেন, প্রশ্নটি মূলত কোথা থেকে ফাঁস হয়েছে, তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় শুধু একটি চক্র জড়িত, এমনটি মনে করার কারণ নেই। একাধিক চক্র ও বিভিন্ন স্তরে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকতে পারে।

এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সম্ভাব্য গ্রাহক, সরবরাহকারী ও মধ্যবর্তী বিতরণকারীদের বিষয়ে গোপন অনুসন্ধান চালানো হয়। এর ভিত্তিতে গত বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।

প্রথমে গত বুধবার মতিঝিল এলাকা থেকে রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মফিজুল একজন চাকরিপ্রার্থী। চক্রের এক সদস্যকে ১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার পর আরও বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় তিনি ওই চক্রের সঙ্গে যুক্ত হন বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

গ্রেপ্তার তিনজনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চক্রের আরও দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের একজন এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম। তাঁকে ঢাকার উত্তরখান এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যজন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম। তাঁকে মিরপুর-১০ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পরে গত বৃহস্পতিবার সাভার এলাকা থেকে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করা হয়। শুক্রবার সকালে মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীরকে।

ফায়েজুল আরেফীন বলেন, নূর মোহাম্মদ প্রশ্নপত্রের উত্তর হাতে লিখে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুলের কাছে পাঠান। পরে চক্রের নিজস্ব পরীক্ষার্থী এবং প্রশ্নপত্র বিতরণের কাজে নিয়োজিত সদস্যদের কাছেও উত্তরপত্র পাঠানো হয়। এ কাজে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল, পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর রুবেল, মফিজুল ও তাঁর সহযোগী সুজন যুক্ত ছিলেন বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক ফায়েজুল আরেফীন বলেন, চক্রটি তিন থেকে চার বছর ধরে দেশের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের নিয়োগ জালিয়াতি ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। কোনো সরকারি দপ্তরে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলেই চক্রটি সক্রিয় হয়ে উঠত। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অসাধু কম্পিউটার অপারেটর এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কিছু কর্মচারীর মাধ্যমে প্রথমে আবেদনকারী পরীক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহ করা হতো। পরে তাঁদের লক্ষ্য করে যোগাযোগ করা হতো।

তার বলেন, পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যাংক চেক বা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি করে টাকা লেনদেন করা হতো। জামানত হিসেবে তাদের সার্টিফিকেট ও পরীক্ষাসংক্রান্ত নথিপত্র রেখে দেওয়া হতো। এ ছাড়া পরীক্ষার্থীদের শরীরে বিভিন্ন আধুনিক ডিভাইস বসিয়ে প্রশ্নের উত্তর সরবরাহের কাজও চক্রটি করত বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসআরবির দাবি, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায় এবং দ্বিতীয় শ্রেণির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হতো। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অন্যান্য নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গেও জড়িত বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

ফায়েজুল আরেফীন বলেন, চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা নেওয়ার তথ্য প্রাথমিকভাবে পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং উদ্ধার করা আলামত বিশ্লেষণ করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস, সরবরাহের বিভিন্ন ধাপ ও অন্য জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ১০০ টাকা মূল্যমানের ১১৬টি স্ট্যাম্প, ৫০ টাকা মূল্যমানের চারটি স্ট্যাম্প, এক সেট প্রশ্নপত্র, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্র ও সনদপত্র, বিভিন্ন ব্যাংকের চেক, আটটি মুঠোফোন, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং নগদ চার হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে।

এসআরবি জানিয়েছে, উদ্ধার করা আলামত ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করে চক্রটির কার্যক্রম সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ছায়া তদন্ত করছে। ইতোমধ্যে সংস্থাটির সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধ ও ফরেনসিক দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। কয়েকজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে।

এ ছাড়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে ১২টি ডিভাইস জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মুঠোফোনসহ বিভিন্ন আলামত রয়েছে। এসব ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে।

গত ১০ অক্টোবর রাজধানীর ৯৮টি কেন্দ্রে সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের বাছাই পরীক্ষা আয়োজনের কথা ছিল। ২৪২টি শূন্যপদে নিয়োগের জন্য অনুষ্ঠিতব্য এ পরীক্ষায় আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়।

পরবর্তী সময়ে গতকাল যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরীক্ষা চলাকালে রাজধানীর বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে রেশমা আক্তার নামে এক পরীক্ষার্থীকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।