১০ অক্টোবর ২০২৬, ২১:৫০

প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতেই কক্সবাজার গিয়েছিল স্কুলছাত্রী তাজমিন

রাজু ও তাজমিন   © টিডিসি ফটো

কুমিল্লায় হত্যাকাণ্ডের শিকার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন রাজু চৌধুরী (২০) নামে এক যুবকের ডাকে সাড়া দিয়ে কক্সবাজার গিয়েছিল। রাজু সেখানে একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করেন। ফেসবুকের মাধ্যমে তাদের পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের সম্পর্কের বয়স ছিল মাত্র ১৭ দিন।

চার দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে কক্সবাজার থেকে বাসে করে কুমিল্লায় ফেরে তাজমিন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা প্রবেশমুখ পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানের সামনে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাস থেকে তার নামার দৃশ্য সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে। সেখান থেকে শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে সে। পরে অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়া (৩৫) তাকে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সুমন আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

কক্সবাজার কক্সেস প্যানারেমিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সির কর্মী আবদুল্লাহ শনিবার রাতে গণমাধ্যমকে জানান, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত ৮টার পর তাজমিন ও তার বন্ধু রাজু বাসের টিকিট কাটতে তাদের কাউন্টারে আসেন। তখন তাদের একজন ছেলে ও একজন মেয়ে যাত্রী হিসেবেই মনে রেখেছিলেন তিনি। তারা দুজনই সাধারণ যাত্রী বলে মনে হয়েছিল তার।

আবদুল্লাহ জানান, পরদিন বুধবারের বাসের একটি টিকিট কাটেন রাজু। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসটি কুমিল্লার উদ্দেশে কক্সবাজার ছেড়ে যায়। রাতে বাসটি পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানে পৌঁছায়। বাসটি ঢাকা পর্যন্ত চলাচল করে।

তাজমিন হত্যার ঘটনা আলোচনায় আসার পর আবদুল্লাহ বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নেন। সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে বাসে যাওয়া মেয়েটিকে তাজমিন হিসেবে শনাক্ত করেন। পুলিশ তার কাছে তথ্য চাইতে পারে—এমন ধারণা থেকে তিনি আগে থেকেই বিষয়টি নিয়ে প্রস্তুতি নেন। পরে জানতে পারেন, তাজমিনের সঙ্গে কক্সবাজার যাওয়া রাজু হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন। পুলিশও জানিয়েছে, এ ঘটনায় হত্যাকারী একজনই—অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া। এরপর রাজুর বিষয়ে আর খোঁজ নেননি তিনি।

তাজমিনের মা কেয়া খাতুন সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে। মেয়েকে সেখান থেকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন তিনি। এ জন্য বান্ধবীর নাম ও তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চান। কিন্তু তাজমিন কিছু জানায়নি।

মেয়ের বন্ধুবান্ধব নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন কেয়া খাতুন। কোনো অঘটন ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি তিনি। মেয়েকে চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করতেন এবং তার চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে খোঁজ নিতেন। এত সতর্কতার পরও মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি তিনি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তাজমিনের মা যে বান্ধবীকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন, তার বয়স তাজমিনের চেয়ে বেশি। তবে হত্যাকাণ্ডে ওই বান্ধবী বা তার পরিবারের সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তাজমিন অবাধ্য হয়ে উঠেছিল এবং পাবজিসহ মোবাইল গেমে আসক্ত ছিল।

তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ বলেন, ‘আমি তাকে দীর্ঘদিন পড়িয়েছি। সে খুবই চঞ্চল স্বভাবের ছিল। তার মা অসুস্থ হলে দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখভাল করত তাজমিন। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। এ কারণে তার বাবা সকালে বাসা থেকে বের হলে রাতে ফিরতেন। তবে বাবা তাজমিনকে খুব আদর করতেন। ঘরে রাগ হলে সে হুটহাট করে বাসা থেকে বের হয়ে যেত।’

পুলিশ জানায়, বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা বাস থেকে পদুয়ারবাজারের হোটেল নূরজাহানের সামনে নামে তাজমিন। এরপর রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে সে। পথে সুমন তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করেন বলে পুলিশের ভাষ্য। গ্রেপ্তারের পর তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সাবেক সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান মনে করেন, রাজুর সঙ্গে তাজমিনের সম্পর্ক না থাকলে হয়তো তাকে কক্সবাজার যেতে হতো না। সে ক্ষেত্রে এমন বিপদের মুখেও পড়তে হতো না তাকে।