ধর্ষণের পর হত্যা করে পাশের পুকুরে গোসল করেন আসামি সুমন
কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৫) ধর্ষণের পর গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়ার বিরুদ্ধে। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলের পাশের একটি মসজিদের পুকুরে গোসল করেন তিনি। পরে নিহতের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে আইফোন নিয়ে তা লুকিয়ে রেখে আরেকটি ভাড়ায় চালিত অটোরিকশায় বাখরাবাদে যান। সেখান থেকে চট্টগ্রামে পালিয়ে যান সুমন।
শনিবার (১০ অক্টোবর) কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া। এর আগে অভিযুক্ত সুমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহত শিক্ষার্থীর ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, গত বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর রেসকোর্স এলাকায় যাওয়ার জন্য সুমনের সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমিন। তবে পদুয়ার বাজার এলাকা থেকে শহরের দিকে না গিয়ে চালক তাকে নিয়ে ভিন্ন পথে বিজরার দিকে রওনা হন। দীর্ঘ সময় বিভিন্ন সড়কে ঘোরানোর পর তাজমিনকে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি নির্জন সড়কে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে তাজমিনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হলে সে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এ সময় দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে অটোরিকশাটি সড়কের পাশের ধানখেতে কাত হয়ে পড়ে যায়। পরে কিশোরী দৌড়ে পালিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। তবে শারীরিক দুর্বলতার কারণে একপর্যায়ে সে কাবু হয়ে পড়ে।
পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে সুমন স্বীকার করেছেন, সেখানে তাজমিনকে ধর্ষণের পর নিজের গামছা গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন তিনি। হত্যাকাণ্ডের পর পাশের একটি পুকুরে গোসল করেন সুমন। এরপর তাজমিনের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি আইফোন নিয়ে নেন। মুঠোফোনটি স্থানীয় একটি ধানখেতে লুকিয়ে রেখে অটোরিকশাটি ঘটনাস্থলে ফেলে চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যান তিনি।
ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন নম্বরের সূত্র ধরে ছায়া তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তের একপর্যায়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি এলাকা থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন পুরো ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন। তাঁকে আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে। আদালতে অভিযুক্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবেন কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসামিকে আদালতে উপস্থাপনের পর এ বিষয়ে স্পষ্ট হওয়া যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান, গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) পবিত্র সরকার ও উপপরিদর্শক অর্ণবসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় মরদেহের পাশে একটি অটোরিকশাও পড়ে ছিল।
নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়াতলা গ্রামের আব্দুল আলিমের মেয়ে। তাঁর বাবা রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা অঞ্চলে চাকরি করায় পরিবারের সঙ্গে নগরীর রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকত তাজমিন। সে কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সে স্কুলে অনুপস্থিত ছিল বলে জানিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। বুধবার রাত ১২টা ১৯ মিনিটে তাকে সর্বশেষ কুমিল্লার হোটেল নূরজাহানের সামনে দেখা যায়।
এরপর রাত ২টা ৫৮ মিনিটে বাবার হোয়াটসঅ্যাপে নিজের ‘লাইভ লোকেশন’ পাঠায় তাজমিন। তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে একটি বার্তাও পাঠিয়েছিল সে। তবে গভীর রাতে বাবা ঘুমিয়ে থাকায় সময়মতো বার্তাটি দেখতে পাননি। পরদিন সকালে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের পর স্বজনরা তাজমিনকে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।