০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:১১

তাজমিন কি আসলেই কক্সবাজার গিয়েছিল, কেন? কী বলছে পুলিশ

তাজমিনের বাবা ও তাজমিন   © সংগৃহীত

কক্সবাজার থেকে বাসে কুমিল্লায় ফিরেছিল জান্নাতুল তাজমিন (১৫)। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পদুয়ার বাজারে বাস থেকে নামার পর কী ঘটেছিল তার সঙ্গে? কীভাবে সে পৌঁছাল লালমাইয়ের নির্জন ধানক্ষেতে, যেখানে পরদিন উদ্ধার হলো তার মরদেহ? সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর রহস্যজনক যাত্রাপথ ও হত্যাকাণ্ডের পেছনের ঘটনা খুঁজতে গিয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। এরই মধ্যে ঘটনায় জড়িত সন্দেহে চট্টগ্রাম থেকে এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালককে আটক করা হয়েছে।

তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর একপর্যায়ে কক্সবাজারে যায় তাজমিন। বুধবার (৭ অক্টোবর) দুপুরের পর সেখান থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেয় সে। ওই দিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে কিশোরীটি। এরপর কীভাবে সে লালমাইয়ের জগতপুর এলাকার ধানক্ষেতে পৌঁছাল, তা তদন্ত করছে পুলিশ।

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস জানান, নূরজাহান হোটেল থেকে ঘটনাস্থল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি তাজমিনকে বহন করে থাকতে পারে এমন সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির বিষয়েও তদন্ত চলছে। অটোরিকশাটি শনাক্ত করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুজ্জামান জানান, তাজমিনের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। ঘটনাস্থলের আশপাশের অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। এসব আলামত দেখে কিশোরীটি প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ।

এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকালে চট্টগ্রাম নগরী থেকে সুমন নামে এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালককে আটক করেছে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার সকালে যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামে তার মরদেহ দাফন করা হয়। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ তার মা-বাবা ও স্বজনেরা।

বৃহস্পতিবার গভীর রাতে তাজমিনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রিয়জনের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন এবং ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তার মা-বাবা ও স্থানীয়রা।

তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ার আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা শহরে থাকত সে। সেখানে স্থানীয় ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত।

শুক্রবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ায় তাজমিনের বাড়িতে শোকাহত স্বজনদের ভিড় দেখা যায়। মেয়েকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ তার মা কেয়া খাতুন। সাংবাদিকেরা স্বজনদের ছবি তুলতে গেলে ক্ষোভ ও কষ্ট প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘কী হবে এসব ছবি তুলে! আমার কলিজার পাখিটা যখন চলে গেছে; এখন আর কিছু বলব না।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কেয়া খাতুন জানান, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে এবং তাকে সেখান থেকে নিয়ে যেতে বলেছিল। মেয়ের কাছে বান্ধবীর নাম ও তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও সে কিছু জানায়নি বলে দাবি করেন কেয়া খাতুন।

তাজমিনের মা ওই বান্ধবীর ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তার দাবি, ওই বান্ধবীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে পুলিশের তদন্তে কী তথ্য পাওয়া গেছে, তা এখনো জানা যায়নি।

তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম কুমিল্লা শহরে একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে তিনি শোকে স্তব্ধ। তিনি জানান, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। এরপর বিভিন্ন সময়ে ফোনে যোগাযোগ করা হলে সে বান্ধবীর বাসায় আছে বলে জানিয়েছিল।

আবদুল আলীম বলেন, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে মেয়ের কাছ থেকে একটি খুদে বার্তা ও লাইভ লোকেশন পান। বার্তায় তাকে এসে নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। তখন ঘুমিয়ে থাকায় তিনি বার্তাটি দেখতে পারেননি। সকালে ঘুম থেকে উঠে বার্তাটি দেখেন। পরে লাইভ লোকেশন অনুসরণ করে মেয়ের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে তার মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি জানতে পারেন বলে জানান তিনি।

আবদুল আলীম বলেন, তিনি এখন কাউকে নিয়ে অনুমানভিত্তিক অভিযোগ করতে চান না। মেয়ের সঙ্গে কী ঘটেছিল, কারা তাকে হত্যা করেছে এবং ঘটনার পেছনে কী রহস্য রয়েছে, তা জানতে চান। জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করার দাবি জানান তিনি।

স্থানীয়রা জানান, তাজমিনের কোনো ভাই-বোন ছিল না। সে মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। বিভিন্ন ছুটিতে মা-বাবার সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসত। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পরিবারটি ভেঙে পড়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

তাজমিন কীভাবে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফিরল, পদুয়ার বাজার থেকে লালমাইয়ের ঘটনাস্থলে কীভাবে পৌঁছাল এবং হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী দল। ঘটনার বিস্তারিত জানাতে পুলিশ সংবাদ সম্মেলনের কথা জানিয়েছে।