মামলার কথা বলে টিপসই নিয়েছিল ছেলে, সব সম্পত্তি হারিয়ে আদালতে শতবর্ষী মা
‘জমি নিয়ে মামলা চলছে’—এমন কথা বলে শতবর্ষী মা ও তার প্রয়াত স্বামীর টিপসই নেওয়ার পর প্রায় ১২ বিঘা কৃষিজমি, আমবাগান ও বসতভিটাসহ পারিবারিক সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। শুধু সম্পত্তি নিজের নামে নেওয়াই নয়, পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ এবং জরাজীর্ণ ঘরটি মেরামতেও বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
শেষ বয়সে নিজের বসতভিটা ও সম্পত্তির অধিকার ফিরে পেতে এখন আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন ১০০ বছর বয়সী রহিমা খাতুন ওরফে মনোয়ারা রেফুল। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা মাঝপাড়া গ্রামের এই বৃদ্ধার অভিযোগ, নিজের ইচ্ছায় তিনি কোনো সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেননি। অথচ টিপসই নেওয়ার পর জানতে পারেন, তার ও স্বামীর সম্পত্তি ছেলের নামে রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে।
অভিযুক্ত মো. মুখতারুজ্জামান বুয়েটের সিনিয়র টেকনিক্যাল অফিসার। তিনি রহিমা খাতুন ও তার প্রয়াত স্বামী এসলাম হোসেনের সাত সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। স্বামীর মৃত্যুর পর বর্তমানে ছোট ছেলে ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে পৈতৃক বাড়িতে বসবাস করছেন শতবর্ষী রহিমা খাতুন।
পরিবার ও স্থানীয়দের ভাষ্য, রহিমা খাতুন যে ঘরে বসবাস করেন সেটি দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ। টিনের চাল ফুটো হয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। ঘরের বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে। কাঠের অংশেও ঘুন ধরেছে। এমন অবস্থায় ঘরটি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হলেও মুখতারুজ্জামান এতে বাধা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন তার মা ও ছোট ভাই।
রহিমা খাতুনের অভিযোগ, জমি নিয়ে মামলা চলছে—এমন কথা বলে তার ও তার স্বামীর কাছ থেকে টিপসই নিয়েছিলেন মুখতারুজ্জামান। পরে তিনি জানতে পারেন, সেই টিপসই ব্যবহার করেই তাদের সম্পত্তি ছেলের নামে লিখে নেওয়া হয়েছে।
শতবর্ষী এই নারী বলেন, ‘জমি সংক্রান্ত মামলা চলছে বলে টিপসই নিয়েছিল আমার ছেলে। পরে জানতে পারি, আমার ও আমার স্বামীর জমি তার নামে লিখে নিয়েছে। এখন আমাকে ও ছোট ছেলে ইসমাইলকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। আমি কোনো সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দিইনি। শেষ বয়সে নিজের বসতভিটাটুকু নিয়ে আমি আদালতে যেতে বাধ্য হয়েছি।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, বিষয়টি সমাধানের জন্য স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ হয়েছে। রহিমা খাতুন থানায় অভিযোগ দেওয়ার পাশাপাশি জেলা লিগ্যাল এইডেরও দ্বারস্থ হয়েছেন। তবে এসব উদ্যোগের পরও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে দাবি পরিবারের।
রহিমা খাতুনের ছোট ছেলে ইসমাইল হোসেন বলেন, তাদের বাবা-মায়ের প্রায় ১২ বিঘা ধান ও আমের জমি এবং বসতবাড়ি রয়েছে। এসব সম্পত্তি মুখতারুজ্জামানের নামে লিখে নেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
ইসমাইল বলেন, ‘আমি সামান্য আয় করি। মাকে দেখাশোনা করছি। বাড়িটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মেরামতের চেষ্টা করলেও ভাই করতে দিচ্ছেন না। উল্টো বাড়ি খালি করার জন্য চাপ দিচ্ছেন।’
পরিবারের অন্য দুই সদস্য আলিম হোসেন ও খাইরুল হোসেনও একই অভিযোগ করেন। তাদের দাবি, সাত ভাই-বোনের মধ্যে বাকি ছয়জনকেই সম্পত্তির অংশ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বাবা-মাকে ভুল বুঝিয়ে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি নিজের নামে নেওয়ার পরও মুখতারুজ্জামান তাদের মায়ের খোঁজখবর রাখছেন না বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এ বিষয়ে বালিয়াডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউল হক কমল সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয়ে একাধিকবার গ্রাম্য সালিশ হয়েছে। সালিশে বিষয়টি সমাধানের জন্য বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হলেও অভিযুক্ত তা মানেননি।
তিনি বলেন, ‘দলিলপত্র দেখে মনে হয়েছে, আইনগতভাবে তার পিতার সম্পত্তির মালিক এখন তিনি। তবে প্রতারণা করে বা যেভাবেই হোক সম্পত্তি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সালিশে তার মা বারবার বলেছেন, তিনি কোনো সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেননি।’
এদিকে সম্পত্তির অধিকার ও বসতভিটা রক্ষার দাবিতে গত ৩১ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জের যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতে মামলা করেছেন রহিমা খাতুন। মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে তার ছেলে মুখতারুজ্জামানকে।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. সোহরাব আলী মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, মামলার মূল অভিযোগ হলো মুখতারুজ্জামান তার বাবাকে ভুল তথ্য দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়ে যান এবং টিপসইয়ের মাধ্যমে জমি নিজের নামে রেজিস্ট্রি করান। পরে একই কৌশলে মায়ের কাছ থেকেও টিপসই নিয়ে সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেওয়া হয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে মো. মুখতারুজ্জানের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।