২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৪

অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা ৭ দিন আগেই, যোগাযোগ হয় টিকটকে

কুবি শিক্ষক নাহিদা বেগমের ছেকে অপ্রতিম   © সংগৃহীত

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ আগেই করা হয়েছিল। ছবি তোলা ও টিকটক তৈরির সূত্রে অপ্রতিমের সঙ্গে পরিচয় হয় গ্রেপ্তার আসামিদের। পরে তার আইফোনের প্রতি লোভ থেকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। টিকটকে যোগাযোগের পর ছবি তোলার কথা বলে ১৩ বছরের অপ্রতিমকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আইফোন নেওয়ার পর ফোন ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে কথা-কাটাকাটি হলে কোদালের হাতল দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয় বলে আদালতে দেওয়া আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।

কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার তিন আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা, অপ্রতিমকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, আইফোন নেওয়া এবং তাকে আঘাত করার বিষয়ে অনেকটা মিল রয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সময়ের বর্ণনায় তাদের বক্তব্যে কিছুটা ভিন্নতা পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তিন জবানবন্দির মধ্যে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন তুহিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ-ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। তার বন্ধু সিয়ামের মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক করার জন্য অপ্রতিম তাদের সঙ্গে বের হতো।

তুহিন জবানবন্দিতে বলেছেন, অপ্রতিমের আইফোনের ওপর তাদের দুজনের লোভ হয়। ‘দুজন’ বলতে তিনি নিজে ও অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটির কথা বলেছেন। তুহিনের দাবি, ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের কিছুটা সামনে তাদের দুজনের দেখা হয়। সেখানেই আইফোন নেওয়া এবং অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরের জবানবন্দিতেও আগের শুক্রবারের ওই বৈঠকের কথা এসেছে। তবে ওই কিশোর পরিকল্পনার দায় মূলত তুহিনের ওপর দিয়েছে। তার বক্তব্য, ‘তুহিন আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে মারার প্ল্যান করে।’

তৃতীয় জবানবন্দিতে অপর কিশোর বলেছে, ঘটনার দিন বিকেলে তার বন্ধুই তাকে পরিকল্পনার কথা জানায় যে তুহিনের সঙ্গে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে।

তিন আসামির জবানবন্দির এই অংশে মিল রয়েছে যে, অপ্রতিমকে হত্যার সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হয়নি। আইফোনকে কেন্দ্র করে আগেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

তুহিনের জবানবন্দিতে আরও এসেছে, হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। অপ্রতিম তাকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। ওই রাতেই টিকটকে অপ্রতিমকে মেসেজ করেন তুহিন। পরে অপ্রতিম একটি মুঠোফোন নম্বর দিলে সেই নম্বরে কথা হয়। পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়।

তুহিনের বর্ণনা অনুযায়ী, অপ্রতিম তার বাবার দোকানে কর্মরত ওই কিশোরকেও একই সময়ে আসতে বলেছিল। তাদের ছবি তোলার কথা ছিল। এই ছবি তোলার সম্পর্কের সুযোগেই অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয় বলে তিন আসামির জবানবন্দিতে বর্ণনা পাওয়া গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ১৩ বছরের অপ্রতিমের চেয়ে পাঁচ থেকে ১০ বছরের বড় যুবকদের সঙ্গে তার মেলামেশা ও সম্পর্ককে তারা ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবে দেখছেন।

উল্লেখ্য কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।