২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:৩৬

দুই দিনেও ধরাছোঁয়ার বাইরে মামলার একমাত্র আসামি বিএনপি নেতা, আলোচনায় নারী এমপিও

গুঁড়িয়ে দেওয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও গ্রেপ্তার চার ‘ভাড়াটে’ হামলাকারী  © টিডিসি সম্পাদিত

রাজধানীর মিরপুরে স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি (মাতৃ-শিশু স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা) সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুর করে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মামলায় ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে শাহ আলী থানা পুলিশ। আজ শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম গণমাধ্যমকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে এ ঘটনায় এখনও মামলার একমাত্র আসামি ও স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এ ছাড়া এ ঘটনায় নাম এসেছে এক নারী এমপিরও।

শাহ আলী থানার ওসি গণমাধ্যমকে জানান, রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে ওই চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—মো. সোহেল (২২), মো. জুয়েল (২৩), জিহাদ হাসান (২১) এবং মো. রাব্বি (২০)। তারা স্থানীয় ভাসমান বাসিন্দা। অর্থের বিনিময়ে হামলায় অংশ নিয়েছিল বলে তারা স্বীকার করেছে। পরে তাদের আদালতে প্রেরণ করেছে পুলিশ।

গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার ঘটনা ঘটে। পরদিন ক্লিনিকের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার শাহ আলী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় হানিফ মিয়া (৫০) নামে স্থানীয় এক বিএনপি নেতাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও প্রায় ২৫০ জনকে আসামি করা হয়।

মামলায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, মুখোশ পরা অন্তত দুই শতাধিক ব্যক্তি নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় তারা হামলাকারীরা প্রায় ৫ লাখ টাকার সরকারি ইপিআই টিকা, ওষুধ, ৪৫ লাখ টাকার আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন, জেনারেটর, ফ্রিজ, এসি এবং নগদ টাকাসহ প্রায় দেড় কোটি টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে।

লুটপাটের পর ভারি যন্ত্রপাতি (যেমন এক্সকাভেটর বা বুলডোজার) ব্যবহার করে একটি পাকা ভবন ও তিনটি সেমিপাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। তাদের ভাষ্য, হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

আরও পড়ুন: মিরপুরে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে: ডিএনসিসি প্রশাসক

ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, হামলার সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে এই ঘটনার পর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। এদিকে হামলার পর ক্লিনিকের জায়গায় ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর নামে একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে লেখা হয়েছে, জমিটি সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ থেকে ইজারা নিয়েছে। 

১৯৭৬ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে সেবা দেওয়ার অধিকার পায় রাড্ডা। এরপর সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে প্রায় ৫০ বছর ধরে বিনামূল্যে ও স্বল্পমূল্যে প্রসূতি মা ও শিশুদের সেবা দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটির। এর কর্মকর্তাদের ধারণা, ১০ কাঠা জমি দখলের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার গণমাধ্যমকে বলেন, প্রতিদিন গড়ে চার শতাধিক মানুষ এখান থেকে সেবা নেন। দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মা, শিশু, কিশোর-কিশোরী ও বয়স্করা এই সেবার ওপর নির্ভরশীল। ভাঙচুরের পর তারা আর সেবা নিতে পারছেন না। যদিও শনিবার ভগ্নস্তূপের ওপর স্বল্প পরিসরে টিকাদান সেবা চালু হয়েছে।

এদিকে মামলার প্রধান আসামি হানিফ মিয়াকে এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তবে হামলার ঘটনায় নিজের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এই বিএনপি নেতা। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমি এ ঘটনায় জড়িতই না। আমি জানিই না, সেখানে কী হয়েছে। আমার নাম আবার কে দিল মামলায়? এ বিষয়ে থানায় খোঁজ নেব।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর আলোচনায় আসা সমমনা দোকানদার মালিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের সদস্য বিএনপি থেকে মনোনীত সংর‌ক্ষিত নারী আস‌নের এম‌পি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং প্রয়াত এম‌পি না‌সির উদ্দিন পিন্টুর বোন ও মিরপুর-১ এর প্রয়াত কাউন্সিলর সা‌য়েদুর রহমান নিউট‌নের স্ত্রী। নিউটন ২০০২ সা‌লে ধানম‌ন্ডি‌তে কালা জাহাঙ্গীর বা‌হিনীর হামলায় খুন হওয়ার পর কাউন্সিলর হ‌য়ে‌ছি‌লেন মি‌ষ্টি।

হামলার ঘটনায় মিষ্টির সংশ্লিষ্টতা নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে ক্লিনিক ভাঙপু‌রের স‌ঙ্গে নি‌জের সং‌শ্লিষ্টতা অস্বীকার ক‌রেছেন তিনি। এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি সাংবাদিকদের বলেন, দলের মধ্যে গ্রুপিংয়ের কারণে হয়তো এ ঘটনায় তার নাম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জড়িয়েছে কেউ। তিনি বলেন, যেহেতু এখন মামলা হয়েছে, আইনগতভাবেই ব্যবস্থা হোক। সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির সঙ্গে আমি যুক্ত আছি। তবে এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।