বরাদ্দের পরও সার পাচ্ছেন না কৃষকরা, পাচার হচ্ছে মিয়ানমারে
কক্সবাজারে সরকারি হিসাবে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ রয়েছে। এরপরও মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনমতো সার পাচ্ছেন না অনেক কৃষক। অভিযোগ উঠেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র ডিলার ও কিছু খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে সার সংগ্রহ করে সীমান্ত ও উপকূলীয় বিভিন্ন রুটে মিয়ানমারে পাচার করছে। এতে স্থানীয় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। ভোগান্তি বাড়ছে প্রান্তিক কৃষকদের।
পাহাড়ি ও সীমান্তসংলগ্ন ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্তবর্তী এলাকা এবং টেকনাফ-উখিয়ার উপকূলীয় বিভিন্ন পয়েন্টকে পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, রাতের আঁধারে ছোট ট্রাক, মোটরসাইকেল ও নৌযানে করে বিভিন্ন চালান সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকায় নেওয়া হয়।
রামুর গর্জনিয়া ইউনিয়নে প্রায় ২ হাজার ৭০০ একর চাষের জমি রয়েছে। ওই এলাকার জুমছড়ির কৃষক মোজাম্মেল বলেন, প্রায় পাঁচ একর জমি চাষ করেও এখনো প্রয়োজনীয় সার দিতে পারেননি। সার না পাওয়ায় ধানখেতের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়াও গর্জনিয়া ও কচ্ছপিয়ার কয়েকটি ডিলারের কাছ থেকে সার পাচারের জন্য নেওয়া হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়ার পাশাপাশি ডিলারদের কাছ থেকে কৃষক নন এমন ব্যক্তিদের কাছেও সার বিক্রি করা হচ্ছে। পরে এসব সার মজুত করে সীমান্তপথে পাচার করা হচ্ছে।
টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের প্রান্তিক কৃষক সাইফুদ্দিন মোবারক বলেন, সারের জন্য ডিলারদের কাছে ঘুরেও প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাননি। একই সময়ে আশপাশের বিভিন্ন রুট দিয়ে সারসহ নানা পণ্য মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে।
টেকনাফ সদর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কচুবনিয়ার কার্ডধারী কৃষক আবদুল গফুর বলেন, যাদের জমির পরিমাণ কম, তারা তুলনামূলকভাবে সার পাচ্ছেন। কিন্তু বেশি জমির কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তথ্য মতে— ৬৪ বিজিবি ৫০ হাজার ৪০০ কেজি, ১১ বিজিবি ২ হাজার ৯০০ কেজি, ৩০ বিজিবি ৫ হাজার কেজি, ২ বিজিবি ৭০০ কেজি এবং ৩৪ বিজিবি ১৪ হাজার ৩০৮ কেজি সার জব্দ করেছে। উখিয়া ও টেকনাফ থেকে ৪৫ জনকে আটক করে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেছে বিজিবি।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আনজুমানপাড়া, টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের উলুবনিয়া, হারাইঙ্গাঘোনা, ঝিমংখালী, কানজরপাড়া, তুলাতলি, কোনারপাড়া ও আমতলী এবং হ্নীলার লেদা, দমদমিয়া খাল, হ্নীলা বাজার, স্টেশন ও রঙ্গিখালীসহ বিভিন্ন এলাকা পাচারের সম্ভাব্য রুট হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন স্থানও পাচারের পয়েন্ট হিসেবে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত। তবে এসব রুটে নিয়মিত সার পাচারের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও তদন্ত ও যাচাই প্রয়োজন।
এদিকে কোস্টগার্ড ও বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজার ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মোট ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯০৮ কেজি সার জব্দ করা হয়েছে। এ সময় সার পাচারের অভিযোগে ১২৭ জনকে আটক করে মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারের টেকনাফ, সেন্টমার্টিন, কুতুবদিয়াসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে কোস্টগার্ড ৩ হাজার ২৫২ বস্তা বা ১ লাখ ৭৪ হাজার ৬০০ কেজি সার জব্দ করেছে। এ ঘটনায় ৮২ জনকে আটক করে বিভিন্ন থানায় ৯টি মামলা করা হয়েছে।
কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার বিএন সাব্বির আলম সুজন বলেন, অভিযানে আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশই শ্রমিক বা বহনকারী। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে পাচারচক্রের মূলহোতাদের শনাক্ত করে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। পরবর্তী ব্যবস্থা তদন্ত কর্মকর্তার ওপর নির্ভর করে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আনজুমানপাড়া, টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের উলুবনিয়া, হারাইঙ্গাঘোনা, ঝিমংখালী, কানজরপাড়া, তুলাতলি, কোনারপাড়া ও আমতলী এবং হ্নীলার লেদা, দমদমিয়া খাল, হ্নীলা বাজার, স্টেশন ও রঙ্গিখালীসহ বিভিন্ন এলাকা পাচারের সম্ভাব্য রুট হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন স্থানও পাচারের পয়েন্ট হিসেবে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত। তবে এসব রুটে নিয়মিত সার পাচারের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও তদন্ত ও যাচাই প্রয়োজন।
একই সময়ে ৬৪ বিজিবি ৫০ হাজার ৪০০ কেজি, ১১ বিজিবি ২ হাজার ৯০০ কেজি, ৩০ বিজিবি ৫ হাজার কেজি, ২ বিজিবি ৭০০ কেজি এবং ৩৪ বিজিবি ১৪ হাজার ৩০৮ কেজি সার জব্দ করেছে। উখিয়া ও টেকনাফ থেকে ৪৫ জনকে আটক করে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেছে বিজিবি।
টেকনাফ ২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান বলেন, হাতেনাতে আটক ব্যক্তিদের পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদেরও মামলায় আসামি করা হচ্ছে। পাচারের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করার দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থার।
অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে জেলার কয়েকটি উপজেলার কিছু ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।—ড. বিমল কুমার প্রামাণিক, উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার
উখিয়া ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজার ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী বিজিবির প্রতিটি ব্যাটালিয়ন সার পাচার রোধে কাজ করছে। স্থলপথে নজরদারি বাড়ানোর পর পাচারকারীরা জলপথ ব্যবহার করছে বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে কক্সবাজারে ইউরিয়ার চাহিদা ১ হাজার ৮৪৩ টন। এর বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৩৪৩ টন। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে ৫০০ টন বেশি ইউরিয়া বরাদ্দ রয়েছে। টিএসপির চাহিদা ও বরাদ্দ ৪৭৫ টন করে। ডিএপির চাহিদা ৭৮৯ টনের বিপরীতে বরাদ্দ ৮৮৯ টন। এমওপির চাহিদা ৩৬৮ টন।
এরপরও সীমান্তবর্তী এলাকার কৃষকদের একাংশ প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বরাদ্দ ও চাহিদার হিসাবের বাইরে সরবরাহ ব্যবস্থার কোনো পর্যায়ে সার অন্যত্র চলে গেলে স্থানীয় বাজারে সংকট তৈরি হতে পারে। পাচারের অভিযোগের পাশাপাশি ডিলার পর্যায়ে অনিয়ম হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সবশেষ গত ১৮ সেপ্টেম্বর উখিয়ার স্থানীয় বাসিন্দারা ১০২ বস্তা সার উদ্ধার করে কৃষি কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করেন।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক বলেন, অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে জেলার কয়েকটি উপজেলার কিছু ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, অনিয়মে জড়িত ডিলারদের নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কালো তালিকা রয়েছে। সেখানে কক্সবাজারের কয়েকজন ডিলারের নামও রয়েছে।
উখিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামনাশিস সরকার জানান, সার পাচার রোধে কৃষকদের সার দেওয়ার সময় বস্তা খুলে দেওয়াসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। উখিয়ায় পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রায় ১২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে দুইজন ডিলারের নামেও মামলা রয়েছে।