১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:৫৫

অপ্রতিমের মৃত্যু, মানতে পারছেন না কেউ

নিহত সপ্তম শ্রেণিপড়ুয়া ছেলে অপ্রতিম।   © ফাইল ছবি

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের সপ্তম শ্রেণিপড়ুয়া ছেলে অপ্রতিমের মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের পেছনের একটি টিলা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তুহিন নামে এক কিশোরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ।

অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে শালবন বিহারে ছবি তুলতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় সে। সন্ধ্যার পরও বাসায় না ফেরায় তার মা কুমিল্লার সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

শনিবার দুপুর ১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের পেছনের একটি টিলায় অপ্রতিমের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের জিলানী। তিনি সেখানে বাঁশ কাটতে গিয়েছিলেন।

আব্দুল কাদের জিলানীর ভাষ্য, বেলা ১২টার দিকে তারা ওই এলাকায় বাঁশ কাটতে যান। সেখানে একটি শিশুকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন, যার শরীরে রক্তের দাগ ছিল। পরে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে বিষয়টি জানান। মামুনসহ কয়েকজন ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ দেখতে পান এবং পুলিশকে খবর দেন।

এর আগে শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক এবং দক্ষিণ মোড়ের একটি দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে। ফুটেজে অপ্রতিমকে তুহিন নামের এক কিশোরের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের দিকে যেতে দেখা যায় বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়।

তুহিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার সালমানপুর এলাকার বাসিন্দা। তার বাড়ি এবং অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের স্থান পরস্পরের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে বলে জানা গেছে।

শনিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মচারীকে তুহিনের বাড়িতে পাঠিয়ে অপ্রতিমের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। এ সময় তার কথাবার্তায় অসংলগ্নতা দেখা যায় বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়। পরে বিষয়টি কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়িকে জানানো হলে দুপুর ১২টার দিকে পুলিশ তুহিনকে আটক করে।

পরে তুহিনের মুঠোফোনের বার্তায় অপ্রতিমকে শুক্রবার বিকেলে বাইরে আসতে বলার তথ্য পাওয়া যায় বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। 

তুহিনকে আটকের বিষয়ে নিশ্চিত করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরিফুল করিম বলেন, কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির সাব-ইন্সপেক্টর মহিবুল আলম ভূঁইয়া বলেছেন, “তদন্তের স্বার্থে সন্দেহজনকভাবে তুহিন নামের একজনকে আটক করা হয়েছে।”

অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ ও শোক দেখা দিয়েছে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী ইকবাল মনোয়ার বলেন, সন্তান হারিয়ে যাওয়ার পরপরই নাহিদা ম্যাম পুলিশকে জানিয়েছে। অন্তত ১২-১৩ ঘণ্টা আগে। এ সময়ে পুলিশ অভিযান চালিয়ে অপ্রতীমকে উদ্ধার করতে পারেনি। পুলিশ ভালোভাবে অভিযান চালালে অপ্রতীমকে আমরা হারাতাম না। বাচ্চাটার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছুদূরে একটা জঙ্গলে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অভিযান চালালে আমরা অপ্রতীমকে হারাতাম না।

কুবির প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী চাঁদনী আক্তার বলেন, জুলাইয়ে শীলা ম্যামের ছেলে মেঘ হায়নাদের থাবায় ছিন্নভিন্ন হয়ে রাস্তায় পড়ে ছিলো। মেঘ বেঁচে ফিরেছে। আর আমরা নাহিদা ম্যামের অপ্রতিমকে দেখলাম লাস হিসেবে। মেঘের মতো অপ্রতিমও ফিরে আসতে পারতো!

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক ড. মশিউর রহমান বলেন, যে মা সন্তান রাতে ঘুমের ঘোরে খাট থেকে পড়ে যেতে পারে ভেবে সারারাত ঘুমান না, সেই মা আজ কীভাবে সেই সন্তানের লাশ কোলে নেবেন! অপ্রতিম আমাদের সন্তান।
তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা দেওয়ার বিনিময়ে প্রশাসন পায় মেডেল আর নিরাপত্তাহীনতার মূল্য হিসেবে মা পায় সন্তানের লাশ। কী নির্মম উপহাস!

কুবির আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবু বকর সিদ্দিক (বাবু) বলেন, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দয়া নয়, সাংবিধানিক ও মৌলিক দায়িত্ব। অথচ একের পর এক ঘটনায় যদি নাগরিকের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এখন আর ফাঁপা আশ্বাস দিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। মানুষ বক্তৃতা চায় না, নিরাপত্তা চায়। প্রেস বিজ্ঞপ্তি চায় না, অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক কার্যকর বিচার চায়।

তিনি আরও বলেন, অপ্রতিম, মাফ করে দিস, বাবা! তুই জান্নাতের ফুল, তুই সেখানেই নিরাপদ। বাংলাদেশ নামের 'জানোয়ারের খাঁচা' থেকে তুই বেঁচে গেলি। আজ যদি একটি শিশুর জীবনও নিরাপদ না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কোথায় খুঁজবে?

এদিকে, অপ্রতিমকে উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানিয়েছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম।

তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর থেকেই আমরা পুলিশ, ডিবি, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমরা ছেলেটিকে আর জীবিত পেলাম না। তার সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটিও পাওয়া যায়নি।’

পুলিশ জানিয়েছে, তুহিনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অপ্রতিমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।