০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:৩৭

আইনজীবীসহ কাউকেই চেনেন না বাদী, বললেন—‘পুরো বাণিজ্য করে ফেলাইছে আমার ওপর দিয়া’

বাদী মিরাজ হোসেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুরুতর আহত হয়েছিলেন  © টিডিসি সম্পাদিত

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত বিজয়ের দিনে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে সংঘটিত গণহত্যার ঘটনায় গত বছরের ১৮ মার্চ একটি মামলা দায়ের করেছিলেন মিরাজ হোসেন। পেশায় শ্রমিক মিরাজ ঘটনার দিন গুরুতর আহত হন। মাথা ও হাতে গুরুতর আঘাত নিয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। তার দায়েরকৃত মামলায় আসামী করা হয়েছে ৩০৬ জনের নামে। অজ্ঞাতনামা আসামী আরও ৫০০ থেকে ৬০০ জন। বাদীর ভাষ্য—আসামীদের কাউকেই চেনেন না তিনি। বরং এই মামলার মাধ্যমে তার ওপর দিয়ে ‘বাণিজ্য’ করা হয়েছে।

সম্প্রতি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এই মামলায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আসাদুজ্জামানের আসামী হওয়ার তথ্য প্রকাশ্যে আসে। এর সূত্র ধরে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেছে, ৩০৬ আসামী, এমনকি মামলায় নিজপক্ষের আইনজীবীকেও চেনেন না বাদী।

চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নির্দেশে ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট যাত্রাবাড়ী থানায় এই মামলা রুজু করা হয়। এতে প্রধান আসামী করা হয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও জুলাই গণহত্যার অপর এক মামলায় ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত পলাতক আসামী শেখ হাসিনাকে। এ ছাড়া তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ সশস্ত্র আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বহু নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরদেরও এতে আসামী করা হয়।

আমি কি সম্বন্ধে মামলা করতে যামু? যারে আমি না চিনি ভাই, একজনের নামে কি লাইগা আমি ভুয়া কেস করুম? মানে এই মামলাটা দিছে, এইটা পুরোটা বাণিজ্য করে ফেলাইছে আমার ওপর দিয়ে। আমি তো মনে করেন ফুটপাতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতেছি। আর আমারে পুরো বাণিজ্য করে ফেলাইছে মামলাটা দিয়া— মিরাজ হোসেন, মামলার বাদী

ঢামেক পরিচালক ডা. আসাদুজ্জামান এই মামলার ১০২ নম্বর আসামী। তবে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ‘ব্রিগেডিয়ার জেনারেল’ র‌্যাংকের হলেও এফআইআরে তার র‌্যাংক বলা হয়েছে ‘মেজর জেনারেল’। অজ্ঞাতনামাসহ এই মামলায় মোট আসামী করা হয়েছে ৮০০ থেকে ৯০০ জনকে।

মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণী (এফআইআর) অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বেলা সাড়ে ৩টার দিকে যাত্রাবাড়ী মোড়ে ছাত্রজনতার ওপর আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হত্যাযজ্ঞ চালায়। সে সময় আসামীরা ‘পরস্পর যোগসাজশে বেআইনি জনতাবদ্ধে দাঙ্গা সংগঠন করে হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত, প্ররোচনা প্রদান এবং ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন’ করেন। তবে কোন আসামী কী ধরনের অপরাধ সংগঠন করেছেন, তা এফআইআরে উল্লেখ নেই।

আরও পড়ুন: যাত্রাবাড়ীর জুলাই হত্যা মামলায় আসামী ঢামেক পরিচালক, আইনজীবীসহ কাউকেই চেনেন না বাদী

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মামলার বাদী মিরাজ হোসেন পেশায় শ্রমিক। তার গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি মতিঝিলে ফুটপাতে কাপড়ের দোকানে কাজ করতেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তিনি মাথা, হাত এবং কোমরে ব্যাপক আঘাত পান। এর মধ্যে মাথার আঘাত ছিল গুরুতর, সেখানে অন্তত ১৪টি সেলাই দিতে হয়েছে। শারীরিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় অর্থনৈতিকভাবেও পিছিয়ে পড়েছেন মিরাজ। ঢাকায় টিকতে না পেরে বর্তমানে থাকছেন মুন্সীগঞ্জে।

জানতে চাইলে মিরাজ হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমি এত বড় মামলা দিছি, উনাদের কাউরে চিনি না। মামলাটা মূলত দিছে কোর্ট থেকে, উকিলে। আমি জানি না যে এত বড় বড় মানুষের নামে আমি মামলা দিব। উকিলে সাইন নিছে, পরে মামলা করছে। কতজন লোকের নামে করছে সেটা তো আর আমি জানি না। পরে গিয়া দেখি ভাই কাগজের পিস, কাগজে বলছে ৩০৭ জন। আমি কই—এত আসামি কোত্থেকে আইলো এটার ভিতরে?’

মামলা করার কোনো পরিকল্পনা ছিল না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কি সম্বন্ধে মামলা করতে যামু? যারে আমি না চিনি ভাই, একজনের নামে কি লাইগা আমি ভুয়া কেস করুম?’

মিরাজ বলেন, ‘মানে এই মামলাটা দিছে, এইটা পুরোটা বাণিজ্য করে ফেলাইছে আমার ওপর দিয়ে। আমি তো মনে করেন ফুটপাতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতেছি। আর আমারে পুরো বাণিজ্য করে ফেলাইছে মামলাটা দিয়া।’

মিরাজ হোসেন দাবি করেন, এই মামলার আইনজীবী রুবেল নামের একজন। তার দেওয়া মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে অ্যাডভোকেট রুবেল জানান, তিনি এই মামলার আইনজীবী নন। তবে কথোপকথনের এক পর্যায়ে মিরাজকে তিনি চিনতে পারেন। মিরাজ অভ্যুত্থানে গুরুতর আহত হয়েছিলেন, এই তথ্যও জানান তিনি।

আমি এত বড় মামলা দিছি, উনাদের কাউরে চিনি না। মামলাটা মূলত দিছে কোর্ট থেকে, উকিলে। আমি জানি না যে এত বড় বড় মানুষের নামে আমি মামলা দিব। উকিলে সাইন নিছে, পরে মামলা করছে। কতজন লোকের নামে করছে সেটা তো আর আমি জানি না। পরে গিয়া দেখি ভাই কাগজের পিস, কাগজে বলছে ৩০৭ জন। আমি কই—এত আসামি কোত্থেকে আইলো এটার ভিতরে? — মিরাজ হোসেন, মামলার বাদী

মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট এসএম ইসমাইল হোসেন। যোগাযোগ করা হলে এসএম ইসমাইল হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, মামলার আসামীদের ব্যাপারে আমি বলতে পারি না, আসলে ওটা বাদী যেভাবে যেভাবে দিয়েছে, সেভাবেই করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমি যেভাবে নোট করেছি—আমি বাদীকে জিজ্ঞাসা করেছি যে আপনি যে নামগুলো দিয়েছেন, এরা সম্পৃক্ত আছে কিনা, আপনি আরজিটা পড়েছেন কিনা? আমি লিগ্যাল যেটা আমার দায়িত্ব সেটা করেছি। বাদী বলল, হ্যাঁ, এগুলো সব ঠিক আছে, আমি পড়েছি, দেখেছি, আপনি করেন।

এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সহযোগী ঢামেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যার মামলার ঘটনায় উষ্মা প্রকাশ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির চিকিৎসকরা। এ ছাড়া ঢামেক পরিচালক বলছেন, টেন্ডার বাণিজ্য করার সুবিধা না দেওয়ায় একটি পক্ষ তার বিরুদ্ধে এই ভুয়া মামলার তথ্য ব্যবহার করছে। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় এবং পরবর্তীতে আহতদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করেছি। এটা এই হাসপাতালে তৎকালীন কর্মরত সকলেই জানেন। টেন্ডারবাজি করতে না পেরে একটা গ্রুপ আমার সম্মানহানির চেষ্টা করছে।