০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৪

টাকা আছে বুঝেই ইসমাইলকে বাস থেকে নামতে দেননি চালক-হেলপার, শ্বাসরোধে হত্যা

জব্দ করা বাস ও চালক-হেলপার-সুপারভাইজার  © সংগৃহীত

রাজধানীর বনানীতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ইসমাইল হোসেন (৪৯) নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় বাসচালক, সুপারভাইজার ও হেলপারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, ইসমাইলের কাছে টাকা আছে বুঝতে পেরে তাকে বাস থেকে নামতে দেওয়া হয়নি। পরে বাসের ভেতরেই হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন বাসচালক সোহেল রানা (৪১), সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন (২৬) এবং হেলপার মো. মনির হোসেন (১৯)।

বনানী থানা সূত্রে জানা যায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর সকাল পৌনে ৯টার দিকে এয়ারপোর্টগামী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের স্টেডিয়ামসংলগ্ন এলাকায় এক ব্যক্তির মরদেহ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। মরদেহটির মুখ ও দুই হাতে স্কচটেপ প্যাঁচানো ছিল। গলায়ও কালো দাগ দেখা যায়। সুরতহাল শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

পরে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নিহতের পরিচয় শনাক্ত করে পুলিশ। তার নাম ইসমাইল হোসেন। পরিবারের সদস্যরা থানায় গিয়ে মরদেহের ছবি দেখে তাকে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় ইসমাইলের ছেলে বাদী হয়ে বনানী থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন।

মামলার তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, ইসমাইল জামালপুরের নিজ গ্রাম থেকে জমি বিক্রি করেছিলেন। সেই টাকা থেকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা সঙ্গে নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুরে যাচ্ছিলেন তিনি। তার ছেলে হাসান জিরানী বাসস্ট্যান্ডে বাবার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তবে বাবার মোবাইল ফোন বন্ধ পান তিনি। ঘটনার তদন্তে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন স্থানে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ। ফুটেজ পর্যালোচনায় একটি যাত্রীবাহী বাসের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হয়। পরে বাসটি শনাক্ত করে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়।

অভিযানে মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ‘রাজ ক্লাসিক’ পরিবহনের বাসটি জব্দ করা হয়। একই সময় বাসটির সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন এবং হেলপার মো. মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পৃথক অভিযান চালিয়ে চালক সোহেল রানাকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার তিনজন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনার বর্ণনাও দিয়েছেন।

তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৪ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে জামালপুরের দিকপাইত বাসস্ট্যান্ড থেকে ইসমাইলকে যাত্রী হিসেবে বাসে তোলা হয়। পথে বিভিন্ন জায়গা থেকে যাত্রী ওঠানামা করতে থাকেন। একপর্যায়ে সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন ইসমাইলের কাছে ভাড়া চান। ইসমাইল লুঙ্গির কোচর থেকে টাকা বের করে ভাড়া পরিশোধ করেন। তখন সুপারভাইজারের ধারণা হয়, ইসমাইলের কাছে আরও টাকা রয়েছে।

বিষয়টি তিনি চালক সোহেল রানাকে জানান। চালকও ইসমাইলের কাছে টাকা থাকার কথা জানতে পারেন। এরপর দুজন মিলে তার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চন্দ্রা বাসস্ট্যান্ডে ইসমাইলকে নামতে দেওয়া হয়নি। অন্য যাত্রীদের গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়। পরে বাসের সুপারভাইজার ও হেলপার মিলে ইসমাইলের দুই হাত স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে ফেলেন। এরপর তার নাক-মুখও স্কচটেপ দিয়ে আটকে দেওয়া হয়। পরে গামছা দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়। একপর্যায়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন তারা।

পরে ইসমাইলের মরদেহ বাসে করে ঢাকায় নিয়ে আসেন আসামিরা। বিমানবন্দর এলাকা দিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠেন তারা। বনানীতে নেমে কাকলী মোড় হয়ে আবারও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠেন। পরে কাকলী থেকে কুড়িলগামী অংশে ১৭৯ ও ১৮০ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী স্থানে ইসমাইলের মরদেহ ফেলে রাখা হয়। এরপর বাসটি কুড়িল বিশ্বরোড হয়ে মহাখালী বাস টার্মিনালে চলে যায়।

পুলিশ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ‘রাজ ক্লাসিক’ পরিবহনের বাসটি জব্দ করেছে। এ ছাড়া দুটি গামছা, বাসের রক্তমাখা দুটি সিট কভার এবং একটি ফিচার মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার সাজু ওরফে লিমনের বিরুদ্ধে দুটি ডাকাতি মামলা রয়েছে। চালক সোহেল রানার বিরুদ্ধেও দুটি ডাকাতি মামলা ও দুটি মাদক মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে দুটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও রয়েছে। এ ঘটনায় বনানী থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে।