০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৬

সালমান শাহর মৃত্যুর ৩০ বছর আজ, এখনো কাটেনি রহস্যের জট

জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ  © সংগৃহীত

ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্ণ হলো আজ। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৪ বছর বয়সে মারা যান নব্বই দশকের এই জনপ্রিয় নায়ক। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও তার মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি হত্যা—এই প্রশ্নের পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। বরং দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি লড়াইয়ের পর ঘটনাটি নতুন করে হত্যা মামলায় গড়িয়েছে।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডের ইস্কাটন প্লাজার নিজ ফ্ল্যাটে সালমান শাহকে সিলিংফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় বলে তার স্ত্রী সামিরা হক জানিয়েছিলেন। পরে তাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার ময়নাতদন্ত হয়।

তবে মৃত্যুর পর থেকেই সালমান শাহর পরিবার বলে আসছিল, এটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যা। এ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলেছে। সালমান শাহর মৃত্যুর পর রমনা থানার পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা করে। ঘটনাটিকে আত্মহত্যা ধরে তদন্ত শুরু হয়। পরে পুলিশ, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং সর্বশেষ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঘটনাটি তদন্ত করে।

বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। তবে তাঁর বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরী শুরু থেকেই এসব সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছিলেন।

২০২০ সালে অপমৃত্যু মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক সিরাজুল ইসলাম প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন। সেখানে বলা হয়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি। তিনি আত্মহত্যা করেছেন। প্রতিবেদনে তাঁর আত্মহত্যার পেছনে পাঁচটি কারণও উল্লেখ করা হয়।

সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় অভিনেত্রী শাবনূরের নামও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। নব্বইয়ের দশকে সালমান-শাবনূর ছিলেন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র জুটি। পর্দার জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও নানা গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। বিশেষ করে সালমান শাহর মৃত্যুর পর শাবনূরের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন দাবি সামনে আসে। বিভিন্ন ব্যক্তির অভিযোগ এবং ২০২০ সালের পিবিআই তদন্তেও তাঁদের সম্পর্ক ও তা ঘিরে পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

তবে বিষয়টি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। শাবনূর কখনো সালমান শাহর অপমৃত্যু কিংবা হত্যা মামলার আসামি ছিলেন না। তাঁর নাম এসেছে মূলত সালমানের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের গুঞ্জন, বিভিন্ন ব্যক্তির অভিযোগ এবং তদন্তে ওই সম্পর্ককে ঘিরে বিরোধের প্রসঙ্গে।

সালমান শাহ মৃত্যুর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে শাবনূরের সঙ্গে তাঁর বিয়ের গুঞ্জন প্রকাশ্যে অস্বীকার করেছিলেন। শাবনূরকে তিনি ছোট বোনের মতো দেখেন বলেও জানিয়েছিলেন। পরে শাবনূরও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।

২০২০ সালের পিবিআই তদন্তে সালমানের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। শাবনূরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে ঘিরে তৈরি হওয়া বিরোধও তদন্তের আলোচনায় আসে। এটিকে আত্মহত্যার পেছনে থাকা সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।

তবে পিবিআইয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। তাঁকে হত্যা করা হয়নি।

২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর অস্ট্রেলিয়া থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শাবনূর ওই ব্যাখ্যাও প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, সালমান শাহ আত্মহত্যা করলেও এর জন্য তাঁকে কেন দায়ী করা হবে। সালমানকে তিনি নিজের ভালো সহশিল্পী হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন অভিযোগকেও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুমও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে শাবনূরের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সংবাদমাধ্যমে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি বলেছেন, সালমানের মৃত্যুর পর শাবনূর কেন তার জানাজায় অংশ নেননি, কিংবা সিলেটের বাসায় গিয়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা করেননি—এগুলো তাদের কাছে কষ্ট ও প্রশ্নের বিষয় ছিল।

তবে এসব বক্তব্য অভিযোগ ও প্রশ্নের পর্যায়েই ছিল। শাবনূর সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় কোনো মামলার আসামি ছিলেন না। পিবিআইয়ের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে আদালতে নারাজি আবেদন করেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে আইনি লড়াই চলতে থাকে।

সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর আদালতের নির্দেশে রমনা থানায় সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করা হয়। এতে তাঁর স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, সামিরার মা লতিফা হক লুসি, খলচরিত্রের অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের মালিক রুবী, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ।