বিদ্যুৎ বিল বেশি আসায় ফেসবুক লাইভে ‘গালি’, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের পুরোনো মামলায় গ্রেফতার কেন?
বিদ্যুৎ বিল বেশি আসার প্রতিবাদ জানিয়ে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ভিডিও পোস্ট, সেখানে বিএনপি সরকার, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে অশালীন ভাষায় গালাগাল। এরপর ওই পোস্টকারীকে থানায় নিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি পুরোনো মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে চালান।
গাজীপুরে সিফাত আবদুল্লাহ নামে একজনকে নিয়ে এই ঘটনা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফেসবুক পোস্টের কারণে আটক করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের পুরোনো মামলায় কেন গ্রেফতার দেখানো হলো- এই প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোতে বলা হয়েছে, প্রায় তিন মাস আগে, জুনে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা একটি মামলা এটি। ঘটনার বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
শুরুতে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া পোস্টের কারণে গ্রেফতারের কথা বলা হলেও পরে পুলিশ দাবি করে, সিফাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হলো নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের গোপন কার্যক্রমে যুক্ত থাকা।
এছাড়া ফেসবুক পোস্টের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেফতার সিফাত আব্দুল্লাহর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও দুই ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
প্রাথমিক তদন্তে সিফাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। অথচ তাকে আটকের পর গাজীপুরের গাছা থানার সামনে অবস্থান নিয়েছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি নেতাকর্মীরা।
দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আলী নাছের খান বলেছেন, গ্রেফতার সিফাত আব্দুল্লাহ এনসিপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং ইনকিলাব মঞ্চের একজন সক্রিয় কর্মী।
এদিকে, তিন মাস আগের একটি মামলায় গ্রেফতার নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি এমন ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বিরোধী মত দমনের চেষ্টা আবারও শুরু হলো কি না এই বিষয়টিও তুলছেন কেউ কেউ। আবার, মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানোর ভাষা এবং মানহানিকর বক্তব্য নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে।
গ্রেফতার নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট দেন গাজীপুরের তরুণ সিফাত আব্দুল্লাহ। বিদ্যুৎ বিল বেশি আসার দাবি করে সরকারের সমালোচনা করেন তিনি। নিজের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন মি. আব্দুল্লাহ। মুহূর্তেই ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর শরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।
বৃহস্পতিবার ওই তরুণকে গাজীপুরের গাছা এলাকা থেকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, ফেসবুক পোস্টের কারণেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়লে ওই রাতেই গাজীপুরের গাছা থানার সামনে তার মুক্তির দাবিতে অবস্থান নেন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি নেতা-কর্মীরা।
কটূক্তির অভিযোগে আটক করা হলেও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি পুরোনো মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে শুক্রবার দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। এক অভিযোগে আটক করে অন্য একটি পুরোনো মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানোর বিষয়টি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী বলেন, মি. আব্দুল্লাহকে মূলত নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলের পরিকল্পনাকারী ও সংগঠক হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে, ফেসবুক পোস্টের জন্য নয়। বর্তমানে ফেসিস্টদের যে ঝটিকা মিছিল গাজীপুরসহ সারাদেশে, সেরকম একটা ঝটিকা মিছিল করার পরিকল্পনা করছিল। সে (সিফাত আব্দুল্লাহ) হলো পরিকল্পনাকারী, মদদদাতা এবং সংগঠক।
তাহলে শুরুতে কেন ফেসবুক পোস্টের কথা বলা হয়েছিল?
এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, এটা ঠিক আছে। কিন্তু মেজর সমস্যা হলো ওইটা (ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতা)। আর এটা হলো মাইনর - ফেসবুক পোস্টের বিষয়টি নিয়ে আমরা একটা জিডি করেছি।
প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারকে নিয়ে ফেসবুকে যে মন্তব্য সিফাত আব্দুল্লাহ করেছেন সে বিষয়ে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই বিষয়ে পরবর্তীতে আমাদের সিনিয়র অফিসার আছেন, তাদের সাথে আলোচনা করে, তাদের দিকনির্দেশনা মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা
গ্রেফতার সিফাত আব্দুল্লাহ গত ছয় মাস ধরে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত প্রাথমিক তদন্তে এই তথ্য পাওয়া গেছে বলে পুলিশ দাবি করছে। অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির একাধিক নেতাকর্মী দাবি করেছেন যে, মি. আব্দুল্লাহ এনসিপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং ইনকিলাব মঞ্চের একজন সক্রিয় কর্মী।
গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী বলছেন, ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীকে নিয়ে একটি ঝটিকা মিছিলের পরিকল্পনা করছিলেন সিফাত আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, সে তো বারবার দল বদলায়, যখন যেদিকে সুবিধা পায়। আগে এনসিপি করত কি না আমি জানি না। এনসিপির স্থানীয় নেতারা বলছে যে সে এনসিপির কেউ না।
যদিও সিফাত আব্দুল্লাহ এনসিপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেছেন এনসিপির একাধিক নেতাকর্মী।
দলটির নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং গাজীপুর থেকে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া আলী নাছের খান বলছেন, সিফাত ইনকিলাব মঞ্চের সরাসরি কর্মী, এনসিপির সমর্থক, গণ-অভ্যুত্থানের সময় তার ছবি ভিডিও সব আছে, জুলাই অভ্যুত্থানে সে আহত যোদ্ধা।
আলী নাছের খান বলছেন, স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের কথায় পুলিশের অতি উৎসাহী কর্মীরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে। ছাত্রলীগের সঙ্গে মি. আব্দুল্লাহর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। সাইবার স্পেসে সরকারবিরোধী সমালোচনা বন্ধ করতেই সিফাত আব্দুল্লাহকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলেও মনে করেন।
প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে সমালোচনা
বাংলাদেশে বিরোধী রাজনৈতিক মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। আওয়ামী লীগর সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত ওই আমলে সাংবাদিক, রাজনীতিক, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীসহ অনেকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে হওয়া মামলা নিয়ে নানা সমালোচনা হয়েছে।
সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানের কথা বলে আসছে বর্তমান সরকার।
কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত কেবল সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করেই পৃথক ঘটনায় অন্তত দশজনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এই পরিস্থিতি নিয়ে যেমন সমালোচনা হচ্ছে, তেমনি সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানোর ভাষা এবং ধরন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মানবাধিকারকর্মী এবং আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সংবিধানে নাগরিকদের কথা বলা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা উল্লেখ আছে, কিন্তু এখানে কিছু শর্তও রয়েছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম বলছেন, ফ্রিডম অব স্পিচ মানেই এটা নয় যে, আপনি যে কারো বিরুদ্ধে কটূক্তি করতে পারবেন বা যে কারো মানহানি করতে পারবেন। কারণ নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা করার অধিকারও সবার রয়েছে।
তিনি বলছেন, সামাজিক মাধ্যমে মিথ্যা বক্তব্য বা কুরুচিপূর্ণ উক্তি প্রচারের মাধ্যমে অন্যের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। ফলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানেই এই নয় যে যা ইচ্ছা তাই বলবো।
এই আইনজীবী বলেন, কেবল প্রধানমন্ত্রীর বিষয়েই নয়, যেকোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রেই মন্তব্য করার ক্ষেত্রে সচেতনভাবে করা দরকার। কারণ এই বক্তব্যের ফলে কারো যদি সম্মানহানি হয়, তাহলে সেটা অপরাধের পর্যায়ে পড়ছে।
তার ভাষ্য মতে, একজনের যেমন নিজের ভাবমূর্তির রক্ষা করার অধিকার রয়েছে, তেমনি ওই ব্যক্তি অন্য কারো সম্মানহানী যেন না করে সেই বিষয়টিও আইনে উল্লেখ আছে।
এছাড়া, এক অভিযোগে আটকের পর অন্য মামলায় গ্রেফতার দেখানো প্রসঙ্গে এই আইনজীবী বলছেন, এটা অন্যায়। যে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার আলোকেই তাকে অভিযুক্ত দেখাতে হবে এবং বিচার করতে হবে।
মত প্রকাশের স্বাধীনতায় কোনোভাবেই হস্তক্ষেপ করা যাবে বলেই মত মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের। কিন্তু সাম্প্রতিক সময় সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনিও। তিনি বলেন, পাঁচই অগাস্টের পর থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন কিছু গালাগালি, অশালীন ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে, যেগুলো সুস্থ-স্বাভাবিক সমাজে একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার।
এই ধরনের অপরাধ যারা করেন তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলেই মনে করেন তিনি। তবে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ করতে গিয়ে যেন মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে বলছেন তিনি।
তিনি বলছেন, সামাজিক মাধ্যমকে যেন কেউ বাজেভাবে ব্যবহার করতে না পারে সেদিকটা যেমন আমাদের ঠিক করতে হবে, আবার খেয়াল রাখতে হবে যে- এটি ঠিক করতে গিয়ে যেন এমন কিছু না করে ফেলি যা মানবাধিকার লঙ্ঘন বা আমাদের কথা বলার অধিকার ক্ষুণ্ন করে ফেলে।