জাল জন্মসনদে চার আসামিকে শিশু বানিয়ে জামিন, আইনজীবীসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ
গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জে জাল জন্মনিবন্ধন তৈরি করে চার প্রাপ্তবয়স্ক আসামিকে শিশু পরিচয়ে তিনটি মামলায় জামিন করানোর চাঞ্চল্যকর ঘটনায় এক আইনজীবীসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে অর্ডার শিটে কাটাকাটি ও আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব করার অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে তদন্তে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জিআরও হকিকুল ইসলাম আদেশ প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বুধবার রাতে গোবিন্দগঞ্জ আদালতে এই আদেশ পৌঁছায় এবং এখন আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
গাইবান্ধা শিশু আদালত-২-এর বিচারক ও সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইফতেখার বিন আজিজ এই আদেশ প্রদান করেন। তার নির্দেশনার আলোকে গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারীকে বাদী করে গোবিন্দগঞ্জ থানায় মামলাটি দায়েরের কথা বলা হয়েছে। আদালতের আদেশে অভিযুক্তরা হলেন গাইবান্ধা জেলা বারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শেফাউল ইসলাম রিপন, তার মহুরি মো. হাসান আলী এবং গোবিন্দগঞ্জ চৌকি আদালতের সাবেক জেনারেল রেজিস্ট্রার অফিসার (জিআরও) পুলিশ সদস্য মো. আব্দুস সবুর।
জানা গেছে, গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশ সাইবার অপরাধসহ একাধিক মামলায় অভিযান চালিয়ে হ্যাকার পলাশ রানা, সুমন মিয়া, শামীম চৌধুরী ও এনামুল হক নামের চার প্রাপ্তবয়স্ককে গ্রেপ্তার করে। পরে আসামিদের স্বজনরা জামিন করানোর জন্য আইনজীবী শেফাউল ইসলাম রিপনের শরণাপন্ন হন। ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর তিনটি মামলায় প্রাপ্তবয়স্ক ওই চারজনকে জাল জন্মসনদ ব্যবহার করে শিশু পরিচয়ে জামিন করানো হয়।
ঘটনা ফাঁস হয় যখন আদালতের কয়েকজন আইনজীবী ওই জামিন বাতিলের আবেদন করেন। পরে আদালতের নথি গায়েব ও অর্ডার শিটে কাটাকাটির অভিযোগও ওঠে। এ অবস্থায় গোবিন্দগঞ্জ আমলি আদালতের বিচারক ও সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এস এম গালিব হাসানকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। গত ১৯ আগস্ট তিনি শিশু আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়, আইনজীবী শেফাউল ইসলাম রিপনের সনদ বাতিল, মুহুরি হাসান আলীর নিবন্ধনপত্র বাতিল এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তৎকালীন জিআরও আব্দুস সবুরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
তদন্ত প্রতিবেদনে এই ঘটনাকে দেশের বিচার বিভাগের জন্য কালো অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের জালিয়াতি আইনি ব্যবস্থার ভিত্তিমূলে আঘাত হানে এবং বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করে।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইতিমধ্যে গাইবান্ধা জেলা আইনজীবী সমিতি অ্যাডভোকেট শেফাউল ইসলাম রিপনের সদস্যপদ সাময়িক স্থগিত করেছে।
জেলা বারের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সেকেন্দার আজম আনাম বলেন, ‘জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের এডহক কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনজীবী পেশার মর্যাদা রক্ষায় এমন অসদাচরণে জড়িত কারও বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।’
গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জিআরও হকিকুল ইসলাম বলেন, ‘আদালতের আদেশ অনুযায়ী এখন মামলার প্রক্রিয়া শুরু হবে। তিনি জানান, জালিয়াতির মাধ্যমে জামিন আদায়ের এই ঘটনা অত্যন্ত গুরুতর এবং আদালত এর সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিতে নির্দেশ দিয়েছেন।’
আরও দেখুন: আজ শুভ জন্মাষ্টমী, পূজা-কীর্তন-শোভাযাত্রায় দেশজুড়ে উৎসবের প্রস্তুতি
গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক বলেন, ‘তারা আদালতের আদেশ পেয়েছেন এবং নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে তারা আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করবেন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য থাকবেন।’
আইনজীবী মহল আদালতের এই নির্দেশকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা মনে করছেন, এ ধরনের কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতে আইনি প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি রোধে সহায়ক হবে এবং বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনবে। গাইবান্ধা জেলা আইনজীবী সমিতির কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই ঘটনা আইনজীবী পেশার জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত।
স্থানীয় সুধীজন ও বাসিন্দারাও ঘটনার দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, আদালতের এই আদেশ আইন ও বিচারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গোবিন্দগঞ্জের বাসিন্দা ও সমাজকর্মী আব্দুল লতিফ বলেন, আইনের চোখে সবাই সমান এই কথাটি যেন বাস্তবে প্রতিফলিত হয়, সেজন্য আদালতের এ রায় অত্যন্ত সময়োপযোগী।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আদালতের আদেশ পাওয়ার পর থানায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই মামলাটি নথিভুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন থানা পুলিশের কর্মকর্তারা। আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে এই জালিয়াতির পুরো চক্র উন্মোচন ও দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।