৩১ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৩০

মোটরসাইকেল গতিরোধ করে যুবককে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ

জাহেদুল ইসলাম ও তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেল  © সংগৃহীত

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে মোটরসাইকেল গতিরোধ করে জাহেদুল ইসলাম (৩০) নামের এক যুবককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় যুবদল ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে। এ সময় আরেকজনকে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে।

রবিবার (৩০ আগস্ট) রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার পুরানগড় ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ পুরানগড় গ্রামের ভাঙারগোড়া ফরিদ সওদাগরের দোকানের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত জাহেদুল ইসলাম একই ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কালীনগর গ্রামের নুরুল ইসলাম প্রকাশ সর্বহারা নুরুর ছেলে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় হত্যা, মাদক ও অস্ত্রসহ বিভিন্ন আইনে বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এ ছাড়া নিহত জাহেদুল ইসলামের মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা মোহাম্মদ ওয়াহিদ (২৮) আহত হয়েছেন। তিনি ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত নুরুল আবছারের ছেলে। তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এরপর তিনি বাড়িতে ফিরে গেছেন।

সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত (২৫ আগস্ট) রাতে উপজেলার পুরানগড় ইউনিয়ন পরিষদের পুরাতন কার্যালয়ের সামনে থেকে ২টি আকাশমণিগাছ চুরির ঘটনা ঘটে। পরে গাছগুলো বাজালিয়া ইউনিয়নের শেরেবাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ের পেছনের একটি পুকুর থেকে উদ্ধার করে বন বিভাগ ও ইউপি সংশ্লিষ্টদের উপস্থিত নিলামের মাধ্যমে ২৫ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। এর কয়েক দিন পর রাতের আঁধারে ওই গাছগুলো কাটার মুহুর্তের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে নিহত জাহেদকে দেখা না গেলেও উত্তর সাতকানিয়া সাংগঠনিক উপজেলা ছাত্রদল নেতা জয়নাল আবেদীন মানিক গাছ চুরির সঙ্গে জাহেদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেন।

আরও জানা গেছে, গত (৩০ আগস্ট) রাতে নতুনহাটে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পুরানগড় ইউনিয়ন বিএনপির সংগঠক জসিম উদ্দিন প্রকাশ মিষ্টি জসিমের নেতৃত্বে একটি প্রস্তুতিমূলক সভার আয়োজন করা হয়। ওই সময় রাত ৮টার দিকে জাহেদ নতুনহাটে গেলে মানিককে দেখতে পেয়ে চড়-থাপ্পড় মারেন। এরপর মানিকসহ সেখানে থাকা অন্যরা জাহেদকে ধাওয়া দিলে তিনি মোটরসাইকেলযোগে বাজালিয়ার দিকে পালিয়ে যান। একই দিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে জাহেদ ও তার বন্ধু মোহাম্মদ ওয়াহিদ বাজালিয়া থেকে মোটরসাইকেলযোগে ফেরার পথে সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে মানিক ও পুরানগড় ইউনিয়ন যুবদলের সংগঠক মোহাম্মদ রিদোয়ান ইসলাম দলবল নিয়ে দেশি অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে জাহেদকে কুপিয়ে জখম করে ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত সটকে পড়েন। একই সময় নতুনহাট থেকে প্রায় ২ থেকে ৩ সিএনজিচালতি অটোরিকশা লোকজন ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন বলেও জানা গেছে। পরে স্থানীয়রা জাহেদকে উদ্ধার করে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

সূত্র জানিয়েছে, ২০১৮ সালের (৪ এপ্রিল) চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়ি ইউনিয়নের চিড়িংঘাটা গ্রামে স্থানীয় রাজনীতি ও জায়গা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে চন্দনাইশ উপজেলা শ্রমিক লীগের সহ অর্থ সম্পাদক নুরুল ইসলাম খোকাকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি পুরানগড় ইউনিয়ন বিএনপি নেতা মিষ্টি জসিমের শ্যালক। আর ওই মামলায় নিহত জাহেদুল ইসলাম এজাহারনামীয় আসামি ছিলেন।

পুরানগড় ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ হারুনর রশীদ বলেন, ‘ঘটনার শুরুতে আমি মনে করেছিলাম দুর্ঘটনা হয়েছে। কিন্তু ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি জাহেদ রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে আছেন। অপর পাশে তার মোটরসাইকেলটিও পড়ে ছিল। তার মাথার আঘাতের চিহ্ন দেখে কেউ তার কাছেই যাচ্ছিলেন না। পরে আমরা সবাই মিলে তাকে উদ্ধার করে একটি অটোরিকশায় তুলে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলাম।’

নিহতের মামা শাহেদ আলী বলেন, ‘মিষ্টি জসিম, রিদোয়ান, মানিক, মিষ্টি টিপু, হাবীব, রাজা মিয়া ও তার ছেলেসহ অন্তত ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষ আমার ভাগিনাকে কুপিয়ে এবং পিটিয়ে হত্যা করেছে। এরপর দীর্ঘক্ষণ তার রক্তাক্ত দেহ রাস্তায় পড়ে ছিল। আমরা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শিগগিরই মামলা করব।’

এদিকে নিহত জাহেদুল ইসলামের মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা আহত মোহাম্মদ ওয়াহিদের সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সফল হওয়া যায়নি। তবে তিনি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নিকট ঘটনার সময় মানিক, রিদোয়ান, হাবীব ও মিষ্টি টিপুকে দেখেছেন বলে দাবি করেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে পুরানগড় ইউনিয়ন বিএনপির সংগঠক জসিম উদ্দিন প্রকাশ মিষ্টি জসিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘জাহেদ হঠাৎ করে নতুনহাটে এসে অহেতুক মানিককে মারধর করে দ্রুত সটকে পড়েন। একই সময় আমরা বিএনপির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর প্রস্তুতি সভা করছিলাম। পরে আমি বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাব চুরির বিষয়ে এমপি, রাজনৈতিক নেতা ও ওসির সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে ছিলাম। পরে জাহেদের বিষয়টি আমি বাড়িতে যাওয়ার পর জানতে পেরেছি।’

অপর দিকে এ ঘটনায় অভিযুক্ত বেশ কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ এবং সংযোগ পাওয়া যায়নি। এমনকি তাদের কেউ কেউ এলাকায় নেই বলে জানা গেছে।

তবে এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে উত্তর সাতকানিয়ার সাংগঠনিক উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী রাজিব ও সদস্যসচিব মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘অপরাধী যেই হোক না কেন আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হলে আমরা সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে অবশ্যই সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

পরে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আনিসুল ইসলাম বলেন, ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাংগঠনিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহতের স্বজন ও আহত ভিকটিমের সঙ্গে কথা বলেছি। এরপর বেশ কয়েকজন অভিযুক্তের বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করে তাদের পাওয়া যায়নি। পরে নিহতের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং আমাদের তদন্ত কার্যক্রম চলমান।’