৩১ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৮

মায়ের মৃত্যুর পর টাকা তুলতে গিয়ে ঘুষ দাবি—প্রতিবাদে ছেলে খোলেন ঘুষ.কম ওয়েবসাইট

ঘুষ.সাইট ও শাহেদ শরীফ আহমেদ  © সংগৃহীত

মায়ের মৃত্যুর পর সরকারি পাওনা টাকা তুলতে গিয়ে ঘুষের দাবির মুখে পড়েছিল একটি পরিবার। নিজের পাসপোর্ট করাতেও ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল ১৭ বছরের শাহেদ শরীফ আহমেদের। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ঘুষের অভিযোগ জানানোর জন্য একটি ওয়েবসাইট তৈরি করে সে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির বাইরে ওয়েবসাইটে জমা পড়া অভিযোগগুলো কতটা সত্য, তা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) নামের ওই ওয়েবসাইটটি চালুর পর নয় দিনেই হাজারো অভিযোগ জমা পড়েছে। শনিবার বিকেল চারটা পর্যন্ত ওয়েবসাইটে ৯ হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ জমা পড়ে। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে দাবির মোট অর্থের পরিমাণ ৩২১ থেকে ৩৩৪ কোটি টাকা বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।

তবে ওয়েবসাইটে জমা পড়া সব অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখানো হচ্ছে না। অভিযোগগুলো যাচাই ও স্ক্রিনিংয়ের জন্য চার সদস্যের একটি মডারেশন দল কাজ করছে। ড্যাশবোর্ড থেকে ফিল্টার করার পর যাচাই করা অভিযোগগুলো ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হচ্ছে।

শাহেদ শরীফ আহমেদ ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বাবার সঙ্গে থাকে। সে ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীন কেমব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়াশোনা করছে। পড়াশোনার পাশাপাশি ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট শেখার আগ্রহ থেকেই কোডিংয়ের সঙ্গে তার পরিচয়।

তার মা আমিনা খাতুন ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর শারীরিক অসুস্থতায় তিনি মারা যান। মৃত্যুর সময় তার চাকরির বয়স হয়েছিল ১৩ বছর।

পরিবারের দাবি, আমিনা খাতুনের মৃত্যুর পর তার প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রায় সাত লাখ টাকা পাওনা ছিল। সেই টাকা তুলতে গিয়ে ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ।

পরিবারটির আরও অভিযোগ, কল্যাণ তহবিলের দুই লাখ টাকা এবং চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুর কারণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্য আট লাখ টাকা পেতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কার্যালয়ের ব্যক্তিরা এক লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেছেন। টাকা না দিলে ফাইল এগোবে না বলেও জানানো হয়েছে বলে দাবি পরিবারের।

শাহেদের বাবা শরীফুল ইসলাম শামীম আগে সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পূর্বপাড়া এলাকায়।

শরীফুল ইসলামের ভাষ্য, স্ত্রীর মৃত্যুর পর সরকারি পাওনা তুলতে গিয়ে তিনি ঘুষের মুখে পড়েন। বাধ্য হয়ে প্রায় সাত লাখ টাকা তুলতে ঘুষ দিতে হয়েছে। বাকি ১০ লাখ টাকা পেতেও এক লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ। কম করে হলেও ৮০ হাজার টাকা দিতে হবে বলেও জানানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, কাগজপত্র নিয়ে শিক্ষা অফিসে দৌড়ঝাঁপ করেও কাজ হচ্ছে না। উপজেলা শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিস মিলে এক লাখ টাকা না হলে কাজ হবে না। তবে তিনি ঘুষ না দিয়ে পাওনা টাকা তুলবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ছেলের উদ্যোগে তার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে বলেও জানান।

শাহেদ জানায়, প্রায় দেড় বছর আগে ও-লেভেল পরীক্ষার জন্য পাসপোর্ট করতে গিয়েও তাকে একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। তার অভিযোগ, ফাইল আটকে রেখে ১ হাজার ৫০০ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছিল। টাকা দেওয়ার প্রায় তিন ঘণ্টার মধ্যে কাজ হয়ে যায়।

শাহেদ বলে, মায়ের পেনশনের ফাইল আটকে রেখে লাখ টাকা ঘুষ চাওয়ার ঘটনা এবং নিজের পাসপোর্ট করতে গিয়ে ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই তার মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। সেই ক্ষোভ থেকেই ওয়েবসাইটটি তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় সে।

ভারতে প্রচলিত একটি ওয়েবসাইট দেখে শাহেদ এ ধরনের উদ্যোগের অনুপ্রেরণা পায়। এরপর মাত্র দুই ঘণ্টায় কোডিং করে ওয়েবসাইটটির প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করে। পরে তার বন্ধু ও সহপ্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবিরের সহযোগিতায় ডোমেইন কেনা হয়। ২১ আগস্ট ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়। পুরো উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রায় ১০ হাজার টাকা বা ১০০ ডলার খরচ হয়েছে বলে উদ্যোক্তারা জানান।

ওয়েবসাইটটির দুই প্রতিষ্ঠাতা শাহেদ শরীফ আহমেদ ও সাইফ কবির। শাহেদ কারিগরি ও কোডিংয়ের কাজ করছে। সাইফ বিপণন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের বিষয়টি দেখছে। শুরুতে ওয়েবসাইটটি এত দ্রুত মানুষের নজরে আসবে, এমনটা ভাবেনি শাহেদ। তার ধারণা ছিল, এটি হয়তো নিজের সিভিতে যুক্ত করার মতো একটি প্রকল্প হয়ে থাকবে। কিন্তু ওয়েবসাইট চালুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, ওয়েবসাইটে অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আইনি ঝুঁকি এড়াতে বর্তমানে ভুক্তভোগী বা অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম-পরিচয়ও প্রকাশ করা হচ্ছে না।

শাহেদ বলেন, এখন পর্যন্ত তারা কোনো হুমকি বা নেতিবাচক ফোন পায়নি। ভবিষ্যতে কোনো নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও সে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। লিগ্যাল টিম গঠন বা সরকারি সমর্থন পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ তথ্য ড্যাশবোর্ডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানায় সে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য স্বচ্ছতা তৈরি করা। সরকারি অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং কোথায় অপচয় হচ্ছে, তা মানুষের সামনে তুলে ধরা। একই সঙ্গে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে যেন কাউকে ঘুষ দিতে না হয়, সেই পরিবেশ তৈরি করাই তার লক্ষ্য।

শাহেদের পরিবারের করা ঘুষ দাবির অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মজিবুর রহমান তা অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, কেউ তার কাছে এলে তিনি সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে এলে দ্রুত স্বাক্ষর করে দেন।

শিক্ষক আমিনা খাতুনের পেনশনের টাকা পাওয়া গেলেও কল্যাণ তহবিল ও চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুর কারণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্য মোট ১০ লাখ টাকা কেন পাওয়া যাচ্ছে না, তা জানতে রোববার বিকেলে সদর উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ে যাওয়া হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা শিক্ষিকার ফাইল খুঁজে পাননি।

সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন বলেন, ঘুষ দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাকে কিছু জানাননি। এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে মৃত শিক্ষকের সব বকেয়া দ্রুত পরিশোধের আশ্বাস দেন তিনি।

তরুণদের তৈরি ওয়েবসাইটটির বিষয়টি পুলিশের নজরে এসেছে বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন।

তিনি বলেন, কোনো অনিয়ম বা ঘুষের তথ্য পাওয়া গেলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা তৈরি হলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা ও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেবে।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ময়মনসিংহ জেলা শাখার সহসভাপতি শরীফুজ্জামান বলেন, দেশের দুর্নীতির অন্যতম উৎস ঘুষ। এটি উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি মানুষের মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত করে। বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা ঘুষের অভিযোগ ওয়েবসাইটটির মাধ্যমে সামনে আসছে। সরকার এ ধরনের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতার উদ্যোগ কাজে লাগালে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।