২৭ আগস্ট ২০২৬, ১৫:১৩

রংপুরের চার খুন নিয়ে জনমনে কেন এত প্রশ্ন, সন্দেহ আর অবিশ্বাস?

নিহত গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্য  © টিডিসি সম্পাদিত

রংপুর জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে পুলিশ ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্যে নানা অসঙ্গতি খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। ঘটনার পর পুলিশের দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্য, তদন্তের সূত্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা তথ্যকে ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন ও সন্দেহ।

পুলিশ অবশ্য বলছে, মামলার তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। তবে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে মানুষের মনে এত প্রশ্ন ও অবিশ্বাস তৈরি হওয়ার কারণ কী এ নিয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারাও নানা ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

যেসব প্রশ্ন ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
গত শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে রংপুরের দাসপাড়া-মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পরে মামলা হওয়ার আগেই মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে স্থানীয় দুই ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, এই দুই ব্যক্তি চারজনকে একে একে হত্যা করেছেন। পরে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। এর মধ্যে রয়েছে হত্যাকাণ্ডের সময় বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল কি না, নিহত নারীর ধর্ষণের শিকার হওয়ার কোনো আলামত ছিল কি না, মাদকাসক্ত দুই ব্যক্তি চারজনকে হত্যা করতে পারে কি না এবং আসামি ও এক পুলিশ কর্মকর্তার একই ধরনের শার্ট পরা নিয়ে প্রশ্ন।

এ ছাড়া হত্যার পরও আসামিরা কেন ঘটনাস্থলে অবস্থান করছিলেন, নিহতদের শরীর বা পোশাকে কিংবা ঘটনাস্থলে আসামিদের ডিএনএ বা আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে কি না এসব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নিহত গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ের চোয়াল ভাঙা ছিল কি না, সে বিষয়েও পুলিশ ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্যের অমিল নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন কেউ কেউ।

পুলিশের তদন্ত নিয়ে কেন অবিশ্বাস?
বিশ্লেষকদের মতে, চাঞ্চল্যকর ও অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে মানুষের সন্দেহ তৈরি হওয়া নতুন কিছু নয়। অতীতেও বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের তদন্ত পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা, কুমিল্লার তনু হত্যা, মেজর সিনহা হত্যা, ফেনীর নুসরাত হত্যা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু বকর সিদ্দিক হত্যা মামলাসহ বেশ কয়েকটি মামলার তদন্ত বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা বলেন, ‘পুলিশের তদন্ত নিয়ে মানুষের অবিশ্বাসের অন্যতম কারণ হলো প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশের প্রতি দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট। পুলিশকে একটি বিশ্বাসযোগ্য তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হয়নি।’

আরও দেখুন: ভুল সিদ্ধান্তে থমকে যেতে পারে ক্যারিয়ার, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে যেসব সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ

এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের চাপের কারণেও পুলিশ সব সময় নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে না বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, পুলিশ সরকারের নির্বাহী বিভাগের অংশ হওয়ায় তদন্তের ক্ষেত্রে নানা ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।

তাড়াহুড়ো করে বক্তব্য দেওয়ায় বাড়ে বিভ্রান্তি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, ‘ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণের আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অনুমাননির্ভর বক্তব্য জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করে। স্পর্শকাতর ঘটনায় একেক কর্মকর্তা বা সংস্থার পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য এলে মানুষের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়। তদন্তের শুরুতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো দাবি করলে পরে তদন্তে ভিন্ন তথ্য উঠে এলেও মানুষের মধ্যে অনাস্থা থেকে যায়।’

তিনি বলেন, ‘ফরেনসিক ও অন্যান্য তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া উচিত। তাড়াহুড়ো করে তথ্য প্রকাশের কারণে প্রাথমিক ও পরবর্তী তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি দেখা দেয়, যা থেকেই নানা প্রশ্ন ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।’

তদন্ত কর্মকর্তা যা বলছেন
হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব থানা পুলিশের কাছ থেকে গোয়েন্দা শাখায় হস্তান্তর করা হয়েছে। নতুন তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক জিন্নাত আলী।

তদন্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ওঠা বিভিন্ন প্রশ্নের বিষয়ে তিনি বলেন, মানুষ প্রশ্ন তুলতেই পারে। তবে তদন্ত নিরপেক্ষ ও সঠিক পথে এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় কাজগুলো করা হচ্ছে।

জিন্নাত আলী জানান, মঙ্গলবার রাতে সীমান্ত দাস নামে গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তির এক বন্ধুকে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ঘটনার আগে ওই দুই ব্যক্তি মাদক গ্রহণ করেছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া গেছে কি না জানতে চাইলে জিন্নাত আলী বলেন, ‘আনুষ্ঠানিক ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এখনো হাতে পাননি। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে পাওয়া তথ্যে ধর্ষণের কোনো আলামত নেই বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, ধস্তাধস্তির আলামত থাকতেই পারে।’

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা মাদকাসক্ত কি না, তা নিশ্চিত করতে ডোপ টেস্ট করা হয়েছে কি না এ প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, এখনো ডোপ টেস্ট করা হয়নি। তবে এর জন্য ৯০ দিন পর্যন্ত সময় থাকে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আরও দেখুন: বোল্টের রেকর্ডের চেয়েও দ্রুত দৌড়াল চীনা রোবট তিয়াংগং

একই ধরনের শার্ট নিয়েও প্রশ্ন
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের একজনের পরনে থাকা শার্ট এবং রংপুর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তীর শার্ট একই ধরনের এমন ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।

তবে সনাতন চক্রবর্তী বলেছেন, ‘ওই ধরনের শার্ট রংপুরে তাঁরসহ আরও প্রায় ২০০ জনের রয়েছে। তাঁর শার্ট তাঁর কাছেই আছে এবং বিষয়টি নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’

সব মিলিয়ে, রংপুরের চার খুনের ঘটনায় পুলিশের তদন্তে অগ্রগতির দাবি থাকলেও বিভিন্ন বক্তব্যের অসঙ্গতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা তথ্যের কারণে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সিদ্ধান্তে না গিয়ে ফরেনসিক প্রমাণ, ময়নাতদন্ত, ডিএনএসহ তদন্তের সব তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনা জরুরি। তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা।