রংপুরে শিক্ষকসহ চার হত্যা: আলোচিত সেই শার্ট নিয়ে যা বলছেন আড়ং কর্মকর্তা
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের পরনের শার্ট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। আসামির গায়ের শার্টের সঙ্গে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার ও গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান সনাতন চক্রবর্তীর শার্টের হুবহু মিল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তী বলেছেন, ‘আসামি সিদ্ধার্থ দাসের শরীরে যে শার্ট দেখা গেছে, সেটি তার নয়। তিনি শার্টটি কিনেছেন আড়ং থেকে, একই শার্ট অন্য কেউ আড়ং থেকে কিনতেই পারেন।’
এই বক্তব্যের পর রংপুর আড়ংয়ের নাম প্রকাশে অনচ্ছুক এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আড়ংয়ে এখন এই শার্ট নেই। এই শার্ট নিয়মিত প্রোডাক্ট নয়। কোনো এক ফেস্টিভ্যালে আনা হয়েছিল। সেটা পূজাও হতে পারে, ঈদও হতে পারে। এখন স্টক আউট। দুই-এক মাসের মধ্যে এই শার্ট আউটলেটে আসেনি।’
এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত- এমন কথা তাদের আত্মীয়স্বজনও বলেছেন।
এর আগে, সোমবার (২৪ আগস্ট) বিকেলে নিজের কার্যালয়ে আসামির পরনের শার্ট নিয়ে কথা বলেন সনাতন চক্রবর্তী।
তিনি বলেন, তদন্তে অনেক ধরনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে কোনো একটি প্রমাণকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আড়ং দেশের একটি স্বনামধন্য ব্র্যান্ড। আমিও দীর্ঘদিন ধরে আড়ংয়ের একটি শার্ট ব্যবহার করছি এবং আজও সেটি পরে আছি। আসামির গায়েও একই ধরনের একটি শার্ট ছিল। শুধু শার্টের মিল দিয়ে কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। এমনকি আড়ং যদি বলে, এই শার্টটি শুধু আমার কাছেই বিক্রি করেছে, তারপরও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেতে পারে।’
চারজনকে মাত্র দুজনের পক্ষে হত্যা করা সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চারজনকে একসঙ্গে হত্যা করা হয়নি। তদন্তে এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে প্রথমে দুজন মিলে একজনকে হত্যা করা হয়। পরে দ্বিতীয় ব্যক্তিকে, এরপর তৃতীয় এবং সবশেষে শিশুটিকে হত্যা করা হয়। তাই ঘটনাটি দুজনের পক্ষে সম্ভব নয় এমনটি মনে করার কারণ নেই। তবে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত বলা যাবে।
বৈদ্যুতিক লাইন কাটার বিষয়ে সনাতন চক্রবর্তী বলেন, অভিযুক্তরা বাড়িটিতে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করেছিল। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তারা প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সেখানে ছিল। বের হওয়ার সময় তারা বৈদ্যুতিক লাইন কেটে দেয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, বাড়িটি অন্ধকার করে দিতে এবং বাইরে থেকে কেউ যেন কিছু দেখতে না পারে, সে কারণেই লাইন কাটা হয়েছিল।
তিনি বলেন, অভিযুক্তদের কাছে একটি প্লায়ার ছিল। তাদের ভাষ্যমতে, সেটি পাশের বাড়ি বা ওই বাড়ির ছাদেই ছিল। প্লায়ার দিয়ে তারা মিটারের ওপরের দিকের তার কেটে দেয়। প্রথম দিকে ধারণা করা হয়েছিল, পোলের দিক থেকে লাইন কাটা হয়েছে। তবে পরে বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা এবং তদন্তে জানা যায়, পোল থেকে নয়, মিটারের কাছ থেকেই তার কাটা হয়েছিল। মিটারের কাছ থেকে তার কাটার আলামতও পাওয়া গেছে।
কেমিক্যাল ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে এমন কোনো নমুনা পাওয়া যায়নি, যা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় কোনো ধরনের নির্যাতন বা যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। সিদ্ধার্থ ওই নারীকে ‘কাকিমা’ বলে ডাকত বলেও তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়ার পর এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে।
মুখ ঝলসে যাওয়ার বিষয়টি কোনো কেমিক্যালের কারণে হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে না বলেও জানান ডিবির এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ঘটনার প্রায় ৪২ থেকে ৪৪ ঘণ্টা পর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ততক্ষণে মরদেহে পচন শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং দুর্গন্ধও সৃষ্টি হয়েছিল। আইনগত চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মৃত্যুর পর মৃতদেহে ধারাবাহিকভাবে নানা পরিবর্তন ঘটে। প্রথমে শরীর শক্ত হয়, পরে আবার নরম হতে থাকে। একপর্যায়ে শরীরের ভেতরের বিভিন্ন তরল মুখ ও শরীরের অন্যান্য ছিদ্র দিয়ে বের হয়ে আসতে পারে। ঘটনাস্থলে রক্তের মতো যে পদার্থ দেখা গেছে, সেটি রক্ত নাও হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, অভিজ্ঞতার আলোকে মনে হচ্ছে, সেগুলো মৃতদেহের ভেতরের বডি ফ্লুইড হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, মৃত্যুর ৩৬ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় পার হলে মৃতদেহের ত্বকে ফোসকা পড়া বা চামড়া উঠে যাওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এতে দেখে মনে হতে পারে, মরদেহে আগুন দেওয়া হয়েছে বা কোনো দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছে। তবে পোস্টমর্টেমকারী চিকিৎসকও জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় মরদেহ পড়ে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের পরিবর্তন হতে পারে। তাই প্রাথমিকভাবে দাহ্য বা কোনো কেমিক্যাল ব্যবহারের সম্ভাবনা কম বলেই মনে হচ্ছে। তারপরও ঘটনাস্থল থেকে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এসবের ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়ার পরই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে, সেখানে কোনো কেমিক্যাল বা অন্য কোনো পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছিল কি না।