২৬ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪০

রংপুরে শিক্ষকসহ ৪ হত্যা: ময়নাতদন্তে উঠে এল যে তথ্য

শিক্ষকসহ পরিবারের চার সদস্য  © সংগৃহীত

রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় নিহত শিক্ষকের স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর শরীরে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক দুজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধ বা গলায় ফাঁস দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাদের মৃত্যুর ধরনও হত্যাজনিত বলে মত দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে আসা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রীতিলতা চক্রবর্তীর যৌনাঙ্গ থেকে অণুবীক্ষণিক পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে বাহ্যিক যৌনাঙ্গে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তার গলার মাঝামাঝি অংশে পুরো গলা ঘিরে আড়াআড়ি লিগেচার মার্ক ছিল। ওই দাগের নিচের পেশিতে রক্তজমাটের চিহ্ন পাওয়া যায়। শ্বাসনালি ও খাদ্যনালিতেও অতিরিক্ত রক্তসঞ্চালনের চিহ্ন ছিল।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের মত অনুযায়ী, গলায় ফাঁস বা শ্বাসরোধের কারণে প্রীতিলতার মৃত্যু হয়েছে। আঘাতটি মৃত্যুর আগে করা হয়েছিল। মৃত্যুর ধরন হত্যাজনিত। ময়নাতদন্তের সময় থেকে আনুমানিক দুই থেকে চার দিন আগে তার মৃত্যু হয়। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক জোরপূর্বক যৌন কার্যকলাপের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর প্রতিবেদনেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। তার যৌনাঙ্গ থেকেও পরীক্ষার জন্য নমুনা নেওয়া হয়। তবে বাহ্যিক যৌনাঙ্গে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। গলার মাঝামাঝি অংশে পুরো গলা ঘিরে লিগেচার মার্ক ছিল। ওই দাগের নিচের টিস্যুতে ব্যাপক রক্তক্ষরণের চিহ্ন পাওয়া যায়। এ ছাড়া প্রার্থীর থুতনির ডান পাশে আঘাত ও ফোলা ছিল। ডান চোখের বাইরের অংশ এবং গালের হাড়ের কাছেও ফোলা দেখা যায়। শরীর আংশিক পচে যাওয়ায় বিভিন্ন পোস্টমর্টেম পরিবর্তনের চিহ্নও পাওয়া গেছে।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বাবলু কুমার বিশ্বাস বলেন, নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। পরীক্ষার প্রতিবেদনে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, ধর্ষণের বিষয়ে মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো আলামত থাকলে তা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দৃশ্যমান আলামত না থাকলে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত মতামত দেওয়া হয়।

এর আগে শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরের কামালকাছনা-মাছুয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় রবিবার ভোরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ নামে দুজনকে আটক করা হয়। পরে ওই দিন বিকেলে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা করেন।

আরও পড়ুন: রংপুরে শিক্ষকসহ ৪ হত্যায় নতুন তথ্য দিল ফরেনসিক বিভাগ

পরে রবিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক কারণ ও ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।

পুলিশ কমিশনারের তথ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশের একটি ভবনের ছাদ দিয়ে তার বাড়ির ছাদে প্রবেশ করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিল। এ সময় গণপতি চক্রবর্তী ছাদে উঠে তাদের দেখতে পান। মাদক সেবন ও সেখানে আড্ডা দেওয়ার বিষয়ে তিনি তাদের বকাঝকা করেন।

পুলিশের দাবি, গণপতি চক্রবর্তী তাদের মাদক সেবনের বিষয়টি অন্যদের জানিয়ে দিতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় দুই যুবক। একপর্যায়ে সঙ্গে থাকা গামছা দিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে ধরলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়।

কমিশনার বলেন, গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যার সময় তার বাঁচার চেষ্টা ও শব্দ শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ওপরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সিঁড়িতে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে তাদের ২৫ বছর বয়সী মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এগিয়ে এলে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। প্রার্থী চক্রবর্তীকে হত্যা করতে চার থেকে পাঁচ মিনিট সময় লাগে। একপর্যায়ে আসামিরা রশি দিয়ে তার গলা ও মুখ পেঁচিয়ে ধরে জোরে টান দেয়। এতে তার চোয়াল ভেঙে যায় এবং চোখ বেরিয়ে আসে। পরে ঘরে থাকা ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকেও হত্যা করে তারা।

পুলিশের দাবি, প্রিয়ম আসামিদের চিনত। ভবিষ্যতে সে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অন্যদের জানিয়ে দিতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই তাকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ ওই বাড়ির ওয়াশরুমে গোসল করে। পরে সেখানে বসেই আবার ইয়াবা সেবন করে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এরপর তারা বাসার আসবাবপত্র তল্লাশি করে স্বর্ণালংকার বের করে। পুলিশের দাবি, সিদ্ধার্থ একটি স্বর্ণের দোকানে কাজ করে। তাই আগুন দিয়ে পরীক্ষা করে কোনটি আসল স্বর্ণ, তা শনাক্ত করে নেয় সে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার জুমার নামাজের সময় আশপাশের লোকজন মসজিদে গেলে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের বাড়ির ছাদ দিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। বের হওয়ার আগে তারা ডাইনিং টেবিলে বসে বয়ামে রাখা খেজুর খায়। এ ছাড়া মাদকের প্রভাব কমানোর জন্য ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খায় বলেও জানিয়েছে পুলিশ।