ছাদ থেকে শুরু, এরপর সিঁড়ি হয়ে সর্বশেষ বেডরুম— এর মাঝেই ৪ হত্যা, বর্ণনা শোনালেন পুলিশ
রংপুর মেট্রোপলিটন এলাকার মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় ছাদ থেকে শুরু করে সিঁড়ি পেরিয়ে সর্বশেষ বেডরুম পর্যন্ত হত্যার বর্ণনা দিয়েছেন পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার দুই আসামির কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে বাড়ির ছাদে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। পরে তার স্ত্রীকে সিঁড়িতে, মেয়েকে ঘরের ভেতরে এবং সবশেষে ১২ বছরের শিশু প্রিয়মকে বেডরুমে হত্যা করা হয়।
রোববার (২৩ আগস্ট) রংপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। ঘটনার বর্ণনায় এক পর্যায়ে কেঁদে ফেলেন পুলিশ কমিশনার। তিনি বলেন, নিহতদের মধ্যে ১২ বছরের শিশু থাকায় ঘটনাটি তাকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে। ১২ বছর বয়সী এই নিষ্পাপ শিশু প্রিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় আমি ব্যক্তিগতভাবে আবেগাপ্লুত। শিশুটির বয়স আমার নিজের সন্তানের কাছাকাছি বলে হবে। সেই শিশুকে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার বলেন, গ্রেপ্তার দুজনের নাম মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস। তারা পরস্পরের আত্মীয় এবং একই এলাকার বাসিন্দা। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পাশের একটি ভবনের ছাদ ব্যবহার করে তারা গণপতি চক্রবর্তীদের বাড়ির ছাদে ওঠেন। সেখানে বসে তারা ইয়াবা সেবন করছিলেন। এ সময় ছাদে শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী সেখানে যান এবং তাদের ছাদে বসে আড্ডা দেওয়া ও মাদক সেবনের বিষয়ে আপত্তি জানান। এতে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যেতে পারে; এমন আশঙ্কা থেকে তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় দুজন।
পুলিশ কমিশনার বলেন, গণপতি চক্রবর্তীর কাঁধে থাকা গামছা দিয়েই প্রথমে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। তবে হত্যার সময় তিনি বাঁচার জন্য চেষ্টা করায় শব্দ হয়। সেই শব্দ শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী উপরে আসার চেষ্টা করেন। সিঁড়িতে ওঠার সময় তাকেও গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।
এরপর মা-বাবার চিৎকার ও শব্দ শুনে এগিয়ে আসেন তাদের মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী। তাকেও হত্যা করা হয় বলে জানায় পুলিশ। পুলিশ কমিশনার বলেন, আসামিদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রার্থীর মৃত্যু হতে কয়েক মিনিট সময় লাগে। পরে গলা ও মুখে রশি পেঁচিয়ে টেনে তাকে হত্যা করা হয়।
এরপর দুজন নিচতলায় যান। সেখানে ঘুমিয়ে থাকা ১২ বছর বয়সী শিশু প্রিয়মকে হত্যা করা হয়। পুলিশ কমিশনার বলেন, সিদ্ধার্থের ছোট ভাই অপূর্বর সঙ্গে প্রিয়মের বন্ধুত্ব ছিল এবং তারা একসঙ্গে খেলাধুলা করত। এ কারণে প্রিয়ম দুই আসামিকে চিনত বলে পুলিশকে জানানো হয়েছে। পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই শিশুটিকেও হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
তিনি বলেন, দুজন আসামি শিশুটির ওপর একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গলায় কাপড় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধের পর বালিশ চাপা দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।
‘খুনের পর গোসল, খেজুর ও ইয়াবা সেবন’
চারজনকে হত্যার পরও ওই বাড়িতেই দীর্ঘ সময় অবস্থান করে দুই আসামি। পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য, প্রথমে সিদ্ধার্থ এবং পরে মুগ্ধ বাড়ির একটি বাথরুমে গোসল করেন। এরপর ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর খান এবং ইয়াবা সেবন করেন। ঘটনাস্থল থেকে ইয়াবা সেবনের আলামতও পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতির ঘটনা বলে মনে করাতে ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করা হয়। দুই আসামি বাড়িতে থাকা দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখেন, যাতে কোনো আঙুলের ছাপ না থাকে।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হওয়ার অপেক্ষা করেন দুই আসামি। পরে সুযোগ বুঝে তারা পাশের ভবনের ছাদ ব্যবহার করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। যাওয়ার সময় তারা কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে যান বলেও পুলিশ দাবি করেছে।
পুলিশের ভাষ্য, উদ্ধার করা একটি চুড়িতে আগুন দিয়ে পরীক্ষা করার আলামত পাওয়া যায়। এ সূত্র ধরে তদন্তকারীদের ধারণা হয়, স্বর্ণের কাজ সম্পর্কে অভিজ্ঞ কেউ এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে। পরে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস দীর্ঘদিন ধরে একটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে স্বর্ণের কারিগর হিসেবে কাজ করেন বলে তথ্য পাওয়া যায়।
পুলিশ কমিশনার বলেন, আসামিদের দেখানো মতে কিছু স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলো একটি মন্দিরের পেছনে পরিত্যক্ত স্থানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
‘মাদক সেবনে বাধা দেওয়াই হত্যার মূল কারণ’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তী তাদের বাড়ির ছাদে অনধিকার প্রবেশ করে আড্ডা দেওয়া ও মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
তিনি বলেন, দুই আসামি গণপতি চক্রবর্তীকে ‘স্যার’ এবং তার স্ত্রীকে ‘কাকি’ বলে ডাকতেন। তারা একই এলাকার পরিচিত মানুষ ছিলেন। প্রাথমিক তদন্তে পরিবারের সঙ্গে তাদের কোনো পূর্ববিরোধ বা শত্রুতার তথ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশ কমিশনার বলেন, গ্রেপ্তার দুই আসামির একজন মুগ্ধ দাস সিটি বাজারে একটি মাছের দোকানে কাজ করেন। অন্যজন সিদ্ধার্থ দাস স্বর্ণের কারিগর। তাদের দুজনকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা হয়েছে। মামলাটি সুষ্ঠু তদন্ত করে দ্রুত চার্জশিট দেওয়া এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে বলে জানান পুলিশ কমিশনার। সংবাদ সম্মেলনে ধর্ষণের অভিযোগ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ কমিশনার বলেন, এখন পর্যন্ত হত্যার আগে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
তদন্তের তথ্য দ্রুত প্রকাশ না করার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চারজন নিহত হওয়ার মতো একটি চাঞ্চল্যকর মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার ও তদন্তের প্রতিটি ধাপে পুলিশকে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হয়েছে। তদন্তের স্বার্থেই বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়েছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পুলিশ কমিশনার বলেন, গত তিন মাসে রংপুরে প্রায় দুই হাজার মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মাদক নির্মূলে শুধু পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়, এ জন্য সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, ‘আমার ওপর আস্থা রাখতে পারেন। বাকিটা আপনারা পরবর্তীতে দেখবেন।’ তিনি হত্যাকাণ্ডের রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটনে কাজ করা পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, সিআইডি, গণমাধ্যমকর্মী ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
রংপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামতের ভিত্তিতে আমরা স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়েছি। পরে মাদক সেবন করা ব্যক্তিদের খোঁজ দেয় আমাদের স্থানীয় সোর্স। তাদের তথ্য এবং ভুক্তভোগীর আত্মীয়স্বজনের তথ্যের সঙ্গে মিল করে আমার মূল আসামীদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।’
তারা হত্যার কথা শিকার করে জানিয়ে ওসি বলেন, ‘আসামিদের ডিএনএ টেস্ট করার জন্য ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।’
নিহতরা হলেন- রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী (১২)। গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে রংপুর জিলা স্কুল থেকে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নেন। পরে তিনি রংপুর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিতেন।
তার মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন। সম্প্রতি তিনি মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। আর ১২ বছর বয়সী ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী পড়ত রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে।